Aug 31, 2009

সেটি কি সফল হবে? - জীবনবাহী গ্রহের প্রাচুর্য

পূর্বের আলোচনার পর....

The Abundance of Life-Bearing Planets
By Carl Sagan

জীবনবাহী গ্রহের প্রাচুর্য
কার্ল সাগান


আমরা উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের এক যুগে বাস করি। নেবুলা নক্ষত্রমণ্ডলের মতো গ্যাসের চাকতি ও ধূলিকণা সূর্যসদৃশ নক্ষত্রগুলোর অর্ধেকের মধ্যেই রয়েছে। আমাদের গ্রহগুলি ৪.৬ বিলিয়ন বৎসর আগে গঠিত হয়েছে এই নেবুলা নক্ষত্রমণ্ডলে। বেতার তরঙ্গের এক নতুন, অপ্রত্যাশিত পদ্ধতিতে আমরা অন্ততঃ ২টি পৃথিবীর মতো গ্রহ খুঁজে পেয়েছি। ৫১ পেগাসি (Pegasi) তারকার পাশে এক বিরাটাকার গ্রহ স্পষ্টভাবে দেখাও গেছে।

নিকটবর্তী তারকারাজির পাশে যদি এই বিশালাকার গ্রহগুলি থেকে থাকে তাহলে ভূমিতে স্থাপিত এবং মহাকাশ সম্বন্ধীয় কিছু নতুন প্রযুক্তি যেমন অ্যাসট্রোমেট্রি (Astrometry), স্পেকট্রোফটোমেন্ট্রি (Spectrophotometry), রেডিয়াল ভেলোসিটি মেজারমেন্টস (Radial Velocity Measurements), এডাপটিভ অপটিকস (Adaptive optics) এবং ইন্টারফেরোমেট্রি (Interferometry)- এর সবগুলো গ্রহগুলিকে চিহ্নিত করতে পেরেছে বলেই মনে হয়।

প্রজেক্টগুলোর মধ্যে অন্ততঃ একটি প্রস্তাব (Frequency of Earth Sized Inner Planets) ভিন্নজগতের বিরাট গ্রহগুলিকে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে। যদি আমাদের প্রতি দেয়া সমর্থনকে হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়া না হয় তাহলে মিল্কিওয়ে ছায়াপথের অন্য নক্ষত্রের গ্রহগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার একটি স্বর্ণযুগে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি।

আপনি যদি আরেকটি পৃথিবীর মতো ভরযুক্ত গ্রহ খুঁজে পান, তাহলে এটা পৃথিবীর মতো জগত হবে এমনটা নাও হতে পারে। ধরুন শুক্রগ্রহ। কিন্তু আমরা এই বিষয়টা তদন্ত করতে পারি। আমরা সমুদ্রের জলের অবশিষ্টাংশের বর্ণিল স্বাক্ষর খুঁজতে পারি। গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও ওজন খুঁজতে পারি। গ্রহের আদিম তাপীয় অস্থির পরিবেশে মিথেনের পরমাণু খুঁজতে পারি। আমরা অক্সিজেনের পরমাণুও খুঁজবো কারণ তা জীবনেরই চিহ্ন। (আসলে এইসব পরীক্ষাগুলোর সবই গ্যালিলিও মহাকাশযানের দ্বারা পৃথিবীর উপরিভাগে ১৯৯০ এবং ১৯৯২ সালে করা হয়েছে এবং তা এখন বৃহস্পতি গ্রহ অভিমুখে ছুটে চলছে। [কার্ল সাগান, ১৯৯৩])

নতুন তৈরি হওয়া সৌরজগতগুলোর পৃথিবীর মতো ভরের গ্রহদের সম্পর্কে সংখ্যা ও আয়তন বিষয়ে সংগৃহীত নতুন তথ্যের সাথে বিভিন্ন গ্রহের সাগরগুলোর দীর্ঘস্থায়িত্ব সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে পাওয়া তথ্যকে একত্রিত করে দেখা গেছে প্রত্যেক সূর্যের মতো নক্ষত্রের চারপাশে একের অধিক নীল জগত থাকতে পারে। সূর্যের চাইতে বেশি ঘনত্বের নক্ষত্রের সংখ্যা কিছুটা দুর্লভ। সূর্যের চাইতে কম ভরের নক্ষত্রের পৃথিবীর মতো গ্রহ থাকতে পারে বলে আশা করা যায়। কিন্তু জীবন থাকার মতো উষ্ণগ্রহগুলো হয়তো এমনভাবে আটকে আছে যে তাদের একটি দিক শুধু স্থানীয় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে।

যাহোক, হয়তো বাতাস ওই ধরণের গ্রহের উষ্ণতাকে এক আবহমণ্ডল থেকে আরেক আবহমণ্ডলে বয়ে নিয়ে যায় এবং প্রাণীর সম্ভাব্য বাসস্থান তৈরিতে ওইসব গ্রহের অগ্রগতি খুবই সামান্য।

তা সত্ত্বেও নতুন পাওয়া প্রমাণগুলো এমন তথ্য দিয়েছে যে, ছায়াপথের বেশ কিছু গ্রহে ধারণার চাইতে বেশি পরিমাণ তরল জল বিলিয়ন বৎসর আগে থেকেই আছে। এর মধ্যে কোন কোনটি জীবনের জন্য বেশ উপযোগী। আমাদের মতো কার্বন ও জল রয়েছে এমন গ্রহগুলোর কোনটির বয়স পৃথিবীর চাইতে কম, কোনটির আবার বিলিয়ন বৎসর বেশি। আর হ্যাঁ, আমাদের ছায়াপথ এক বিরাট সংখ্যক হয়তো শত শত বিলিয়ন সংখ্যক গ্যালাক্সির মধ্যে মাত্র একটি।

বাসযোগ্য জগতে বিবর্তনের জন্য কি বুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে?

অ্যাপোলো মিশনের সংগৃহীত চাঁদে উল্কাপাতের পরিসংখ্যান থেকে আমরা জানি যে প্রায় ৪ বিলিয়ন বৎসর আগে পৃথিবীতে সারাক্ষণ মহাকাশ থেকে আসা ছোট-বড় বিভিন্ন রকমের পদার্থের আঘাতে নরকের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। মুহুর্মুহু উল্কাপাত এতো ভয়ানক ছিল যে এর ফলে আবহাওয়া মণ্ডল ও সমুদ্র মহাকাশে বিলীন হয়ে যেতে পারতো। তারও আগে সমস্ত পৃথিবী ডিমের খোসার মতো পাতলা আবরণযুক্ত এক ম্যাগমার মহাসাগর ছিল। আর এটা পরিষ্কার যে সেই অবস্থায় জীবনের উদ্ভবের কোন পরিবেশই ছিল না।

হ্যাঁ, ঠিক তার পরপর, মেয়র যেমন বলেছেন- ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে কিছু প্রাথমিক জৈব পদার্থ তৈরি হয় (ফসিলগুলোর দেয়া প্রমাণ সাপেক্ষে)। অনুমান করা হয় যে, জীবনের সূচনা তার কিছু আগে থেকে শুরু হয়েছিল। এরপর অবস্থা অনুকূলে আসার সাথে সাথে জীবন বিস্ময়করভাবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। আমি এই ঘটনাটা আগেও বলেছি (সাগান, ১৯৭৪)। জীবনের উৎস আসলে এমন একটি সম্ভাবনাময় অবস্থা, যা পরিবেশের আনুকূল্যের সাথে দ্রুত বিকশিত হয়েছে।

এখন আমি বুঝতে পেরেছি যে, এটা আপাতদৃষ্টিতে ন্যায়সঙ্গত বিতর্ক। আসলে সামান্য এক উদাহরণ থেকে অজ্ঞাত অসীম বিষয়ে ধারণা করার চাইতেও বেশি। কিন্তু আমরা উপাত্তের বাইরে কিছু বলতে পারি না, আমরা এই কাজটাই সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারি।

বুদ্ধির বিবর্তনের ক্ষেত্রে কি একই ধরণের বিশ্লেষণ প্রয়োগ করা যায়?

ধরুন একটি গ্রহে জীবন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অক্সিজেনসমৃদ্ধ আবহাওয়ামণ্ডল ২ বিলিয়ন বছর আগে থেকে তৈরি হচ্ছে। মেয়র যেমন বলেছেন, তেমন বহুবিচিত্ররূপে এই পরিবর্তন ঘটছে। আর মাত্র ৪ বিলিয়ন বৎসর একটি যান্ত্রিক সভ্যতার উত্থানের জন্য যথেষ্ঠ নয়।

এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের প্রথমদিকে (যেমন: G.G. Simpson-The Nonprevalence of Humanoids) লোকেরা এই যুক্তি দেখাতেন যে, ঠিক মানুষ অথবা মানুষের মতো কোন কিছু তৈরি হওয়ার জন্য বিশাল সংখ্যক প্রচেষ্টার প্রয়োজন। অন্য কোন গ্রহে এই ধরণের সম্ভাবনার পুনঃপুনঃ সংঘটনের সংখ্যাও শূন্য। এবং ফলে কোন মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা থাকার সম্ভাবনাও শূন্য।

কিন্তু একথা আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাইযে, যখন আমরা মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার কথা বলি, তখন স্টারট্রেকের মানুষ বা মানুষের মত কারও কথা বলিনা। আমরা মানুষের মত সমান ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণী যারা রেডিও টেলিস্কোপ বানাতে এবং পরিচালনা করতে পারে এমন কারো কথা বলি। তারা ভূমি অথবা সমুদ্র অথবা বাতাসে যে কোন জায়গায় বাস করতে পারে। তারা অভাবনীয় রাসায়নিক গড়ন, গঠন, আকার, জৈবিক বৈশিষ্ট্য যে কোন রকম হতে পারে। আমরা এমন মনে করিনা যে মানুষের মত বিবর্তনের একই ধারাবাহিকতা তারা অতিক্রম করেছে। হয়তো বিবর্তনের পথ এত বেশি রয়েছে যার সংখ্যা আমরা ধারণাও করতে পারিনা।

মেয়রের সাম্প্রতিক উপস্থাপনায় মানবসদৃশ প্রাণী না থাকার প্রসঙ্গের প্রতিধ্বনি রয়েছে। তবে আমার ধারণা আমাদের বিতর্কের মূল বিষয়টি সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে। বিবর্তন কোন ভাগ্যনির্ভর বিষয় নয়, এটা উপযুক্ত সময়ে অনিবার্যভাবে ঘটে। ভবিষ্যতের কয়েক বিলিয়ন বৎসরে বুদ্ধিমান প্রাণী তৈরির জন্য কোন পরিকল্পনা এটা নয়। স্বল্পকালীন প্রভাবকের প্রেক্ষিতে এটা হঠাৎ করে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। আর এখনও সবকিছু সমান থাকা সত্ত্বেও বুদ্ধিহীন থাকার চাইতে বুদ্ধিমান হওয়াটা বেশি গ্রহণযোগ্য। আর বুদ্ধিবিকাশের যে গতিপথ তার চিহ্ন জীবাশ্মতেই রয়েছে। অন্য পৃথিবীর কোনটিতে বুদ্ধির প্রতি আগ্রহ উচ্চমাত্রায় রয়েছে, আর কোনটিতে হয়তো রয়েছে কম মাত্রায়।

আমরা যদি কোন একটির উপাত্ত বিশ্লেষণ করি, যেমন আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রে তাহলে দেখবো যে, সৌরজগত সৃষ্টির পর থেকে আজকে যান্ত্রিক সভ্যতার যুগ পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বৎসর লেগেছে। এ থেকে কি বোঝা যায়? আমরা অন্য পৃথিবীতে বদ্ধরূপে সভ্যতা বিকাশ হয়েছে এটা আশা করবো না। কেউ হয়তো বেশ দ্রুত যান্ত্রিক উন্নতি করেছে, কেউ হয়তো ধীরে, আর এটা সন্দেহ নেই যে কোনখানে হয়তো সভ্যতার বিকাশ একেবারে হয়নি। কিন্তু ছায়াপথ (Milky way) দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের তারা দিয়ে ভর্তি (এর অর্থ, যেগুলোতে ভারী পদার্থ রয়েছে)। এর অনেকগুলো ১০ বিলিয়ন বৎসরের পুরনো।

দুটি বিষয় কল্পনা করা যাক, প্রথমটি হল যান্ত্রিক বুদ্ধির বিবর্তনের জন্য সম্ভাব্য সময়ধারা। এটা শুরু হয় খুব ধীরে, কিন্তু কয়েক বিলিয়ন বৎসরে এর অগ্রগতিকে চিহ্নিত করা যায়। ৫ বিলিয়ন বৎসরে এর অগ্রসরের পরিমাণ ৫০ ভাগ, আর ১০ বিলিয়ন বৎসরে হয়তো এই অগ্রসরতা ১০০ ভাগে পৌঁছাবে।
দ্বিতীয় কল্পনাটি সূর্যের মতো তারাগুলিকে নিয়ে। এর মধ্যে কোন কোনটি একেবারে তরুণ। এগুলো এখন জন্মগ্রহণ করল। কিছু আছে যেগুলো সূর্যের মতো বয়সী, আর কিছু আছে, যেগুলো ১০ মিলিয়ন বৎসরের পুরনো।

আমরা যদি এই কল্পনা দুটিকে একসঙ্গে মেলাই, তাহলে দেখবো যে বিভিন্ন তারার গ্রহগুলিতে বিভিন্ন বয়সের যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার দেখা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধুমাত্র নতুনগুলোতে নয়। বরং পুরনো তারাগুলোতে এই সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি। খুব সম্ভব আমরা আমাদের চাইতে অগ্রসর সভ্যতার কাছ থেকে সাড়া পেতে যাচ্ছি। এই যন্ত্রকৌশলী সভ্যতাগুলোতে হয়তো কোটি কোটি প্রজাতি রয়েছে।

একসূত্রে গ্রথিত হয়ে যন্ত্রনির্ভর প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছে এ ধরণের সাদৃশ্যহীন ঘটনার সংখ্যা আশাতীত। আর হয়তো নিজেদের অনন্য বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গর্ব করে এধরণের প্রজাতি সারা মহাবিশ্বেই রয়েছে।

সেটির (SETI) জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য সভ্যতার প্রয়োজন রয়েছে কি?

এটা নিশ্চিতভাবেই কল্পনা করা যায় যে কবিদের সভ্যতা অথবা ব্রোঞ্জযুগের যোদ্ধারা কখনও হঠাত করেও জেমস ক্লার্ক, ম্যাক্সওয়েলের গণিত এবং বেতার যন্ত্রের দেখা পায়নি। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই পৃথিবী অসংখ্য উল্কা ও ধুমকেতু দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে আছে। এর কোন কোনটি এত বড় যে একটির আঘাতেই গ্রহের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল K-T ঘটনা (ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষে সংঘটিত আর এর ফলেই জন্ম হয় টারসিয়ারি যুগের।) ৬৫ মিলিয়ন বৎসর আগের এই ঘটনার ফলে ডাইনোসর এবং পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রজাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আগামী শতাব্দীতে এই ধরণের একটি সভ্যতাবিনাশী সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে।

পৃথিবীর নিকটবর্তী বস্তুসমূহকে চিহ্নিত ও অনুসরণ করার সঠিক অর্থ আমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। এই বস্তুগুলোকে বাধা দেয়া ও ধ্বংস করার কারণ সম্পর্কে বিশদ জানতে হবে। আমরা যদি তা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদেরকে সবংশে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। সিন্ধু সভ্যতা, সুমেরীয় সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, গ্রিক ও অন্যান্য সভ্যতা খুব বেশিদিন টেকেনি ফলে তাদেরকে এ ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। পার্থিব বা অপার্থিব যেকোন দীর্ঘমেয়াদী সভ্যতাকে এই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতেই হবে। অন্য সৌরজদতকে তুলনামূলকভাবে কম বা বেশি গ্রহাণু বা ধুমকেতুর মুহুর্মুহু আঘাত সহ্য করতে হয়। কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিপদের অস্তিত্ব একেবারে বাস্তব।

রেডিওটেলিমেট্রি অর্থাৎ মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা এবং বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ বিশ্লেষণ ও এই সম্পর্কিত প্রযুক্তিকে মহাকাশীয় হুমকির মুখোমুখি হতেই হবে। ফলে যে কোন দীর্ঘকাল টিকে থাকা সভ্যতাকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়ম অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে সেটি'র (SETI) মতো প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাতেই হবে। (এবং এর জন্য বেতার তরঙ্গকে 'দেখতে' পারে এরকম কোন প্রত্যঙ্গ বিকাশের প্রয়োজন নেই। পদার্থবিজ্ঞানই এর জন্য যথেষ্ঠ)।

যখন থেকে গ্রহাণু ও ধূমকেতুগুলোর পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে তখন থেকেই গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাত অবিরাম সহ্য করতে হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তির বিশ্রাম নেবার আর কোন অবকাশ নেই। অবশ্য ধুমকেতু ও উল্কাপিণ্ডের সাথে সংঘর্ষের সম্ভাবনার সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এমন শক্তি সেটির (SETI) খুব কম।

(প্রসঙ্গক্রমে জানাই, এটা সত্যি যে সেটি'র (SETI) শক্তি খুব কম। আমাদের গ্যালাক্সির এক অল্প অংশে এটা পৌঁছাতে পেরেছে। যদি প্রয়োজনমতো শক্তিশালী ট্রান্সমিটার আমাদের থাকত, তাহলে দূরের গ্যালাক্সির রহস্য ভেদ করতে সেটি সক্ষম হতো। আমাদের ট্রান্সমিটারগুলো এত পুরনো ডিজাইনের যে সেগুলো যদি আর একটু শক্তিশালী হতো, শুধু এটুকুই আমরা আশা করতে পারি। Megachannel Extraterrestrial Assay [META] এর এটা একটা অন্যতম প্রচেষ্টা)

সেটি কি প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের স্বপ্নবিলাস?

সেটি (SETI) সম্পর্কিত বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের এবং এ বিষয়ে জীববিজ্ঞানীরাও ভালো জানেন বলে মেয়র বারবার উল্লেখ করেছেন। যখন থেকে প্রকৃতিবিজ্ঞান এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত তখন থেকেই মহাকাশবিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়াররাও সেটি'র (SETI) বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

কিন্তু ১৯৮২ সালে যখন সেটি'র (SETI) বৈজ্ঞানিক মর্যাদা সম্পর্কে 'সাইন্স' পত্রিকায় প্রকাশিত আবেদনটি লিখলাম তখন অনেক নিবেদিতপ্রাণ জীববিজ্ঞানী ও জৈবরসায়নবিদদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে আমার কোন সমস্যা হয়নি। এঁদের মধ্যে ছিলেন ডেভিড বাল্টিমোর, মেলভিন কেলভিন, ফ্রান্সিস ক্রিক, ম্যানফ্রেড এইজেন, থমাস ইসনার, স্টিফেন জে গুল্ড, ম্যাথিউ মেসেলসন, লিনাস পনিং, ডেভিড রাউপ এবং ই.ও.উইলসন। প্রথমদিকে যখন আমি এই বিষয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা তৈরি করছিলাম, তখন আমার বিজ্ঞ পরামর্শদাতা এইচ.জি. মুলারের কাছ থেকে দৃঢ় সমর্থন পেয়েছিলাম। জীববিজ্ঞানী ও জেনেটিকসের উপর নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীর সমর্থন আমাকে খুবই উৎসাহিত করেছিল। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক না করে আমার আবেদনটি যা প্রস্তাব করেছিল, তা হল- আমরা খুঁজছি-

"আমরা সর্বসম্মতিক্রমে দৃঢ়ভাবে একমত যে বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতির পরীক্ষণ একটি পরীক্ষাধীন বিষয়। এই বিষয়ে কোন পূর্বতন আলোচনা এই পর্যবেক্ষণাধীন প্রচেষ্টার পরিবর্তে ব্যবহার বা উপস্থাপন করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।"

কার্ল সাগান: প্লানেটরি সোসাইটির একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞান জগতে খুবই পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি সেটি'র (SETI) একজন প্রধান সমর্থক। সেটি'র সাফল্য নিয়ে তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন।

মূললেখা
Read More ... »

Aug 30, 2009

সেটি কি সফল হবে? মনে হয় না?

Can SETI Succed?
সেটি কি সফল হবে?
অনুবাদ: সুশান্ত বর্মন

মনুষ্যত্বের সীমা ও সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের কোন সংশয় ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সে চিন্তায় পরিবর্তন এনেছে। প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে প্রযুক্তির নিয়মগুলোকে আমরা অনেকাংশে চিনতে পারছি। কিন্তু তাও যথেষ্ট নয়। কারণ ভিন্নগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা আমাদের মনে নতুন আশার বীজ বপন করেছে। মহাজাগতিক সভ্যতা আছে কি নেই তার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। মানুষের বোধগম্য হতে পারে এমন তথ্য খোঁজার ভার য়েছে SETI (SEARCH FOR EXTRA TERRESTRIAL INTELIGENT) মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার অন্বেষণ প্রকারান্তরে আমাদের নিজেদেরকে খোঁজার একটি চেষ্টা। এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা? আর কোথাও কি প্রাণের বিকাশ হয় নি। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সভ্যতা কি মানুষের নিজস্ব আবিষ্কার? সভ্যতা ও প্রযুক্তিতে আমাদের চেয়ে উন্নততর প্রাণী কি আর কোথাও নেই? লক্ষকোটি তারার মাঝে একটিতেও কি প্রাণীরা কোন সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলেনি? এরকম বহুবিধ প্রশ্ন দ্বারা নিরন্তর তাড়না থেকে জন্ম হয়েছে সেটি'র।

১৯৫৯ সালের একটি গবেষণাপত্রে গসিপি কোকোনি (Giussepe Cocconi) এবং ফিলিপ মরিসন (Philip Morrison) সেটি'র কল্পনাকে প্রকাশ করেন। সেটি'র মূল দর্শন জন্ম হয় এই গবেষণাপত্র থেকে। সেখানে লেখা ছিল -"যথাযথ পরিবেশ ও বস্তজগতের নিয়মের প্রেক্ষিতে একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ফলাফল হল জীবন। বস্তুজাগতিক পরিবর্তনের চলমানতা পৃথিবীতে যেমন নিজস্ব লয়ে চলছে ঠিক তেমন একইভাবে অন্য সব জায়গায় চলার কথা।" আমাদের নিজস্ব ছায়াপথে কোটি কোটি তারা রয়েছে। আমরা কোটি কোটি ছায়াপথের মাঝে মাত্র একটিতে বাস করি। সুতরাং এই মহাবিশ্বের প্রান্তরে প্রান্তরে জীবনের সম্ভাবনা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। নিশ্চয় এমন অনেক স্বাভাবিক আবাসস্থল আছে যেখানে বিশাল জ্ঞাতিগোষ্ঠী নিয়ে জীবন্ত প্রাণীরা বাস করছে। এর মধ্যে কোন কোন আবাসস্থলে হয়তো বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটেছে। প্রযুক্তিকেও হয়তো তারা করায়ত্ব করেছে। যেহেতু তারা বুদ্ধিমান, সেহেতু তারা অন্য বুদ্ধিমান প্রাণীদের সাথে নিশ্চয় যোগাযোগ করতে আগ্রহী।

বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে আন্ত:নাক্ষত্রিক যোগাযোগ তৈরি করা যায়। এই তরঙ্গের মাধ্যমে সমগ্র ছায়াপথে অতি সহজে তথ্য আদানপ্রদান করা সম্ভব। কোন কোন মহাজাগতিক সভ্যতা হয়তো বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় স্বাক্ষর দিয়ে নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে চায়। আমাদের তা পড়তে পারা উচিত।

কিন্তু ভিনগ্রহবাসীর উপস্থিতির স্বপক্ষে আজ পর্যন্ত একটা নিখুঁত প্রমাণ আমরা সংগ্রহ করতে পারিনি। যারা মনে করেন এই মহাবিশ্বে প্রযুক্তিগত সভ্যতা একমাত্র মানুষের করায়ত্ব তারাও নিশ্চুপ থাকছেন না। ফলে ভিনগ্রহবাসীর উপস্থিতির স্বপক্ষের আশাবাদী এবং বিপক্ষের নিরাশাবাদী এই দুইরকম তত্ত্বাবলম্বীদের মধ্যে একটা তাত্ত্বিক বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে।

আমরা আজ ভিনগ্রহে প্রাণের উপস্থিতি সম্পর্কে একটি বিতর্ক পাঠ করব। এতে বিষয়টিকে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক দুই দিক থেকেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমে আমরা জানব আর্নেস্ট মেয়র (Ernst Mayr) এর বক্তব্য। তিনি বিংশ শতকের সবচাইতে প্রসিদ্ধ বিবর্তনবাদী বিশেষজ্ঞ। তিনি হার্ভার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক জীববিজ্ঞান জাদুঘরের কর্মকর্তা। তাঁর প্রধান বক্তব্য অনন্য মতবাদের উপর। মেয়র নির্দিষ্ট করে বলেন যে ঘটনার শুরু থেকেই বিভিন্ন রকমের অনন্যতা সেটি'র প্রধান সমস্যা। এর বিপরীতে প্লানেটরি সোসাইটি'র (Planetary Society) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় (Cornell University) এর মহাকাশ চর্চা কেন্দ্রের কার্ল সাগান বক্তব্য দিয়েছেন আশাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। কোন দৃষ্টিকোণ সহজপাচ্য তা জানতে হলে পড়তে থাকুন এবং নিজেই সিদ্ধান্ত নিন।

SETI (সেটি) কি সফল হবে? মনে হয় না?
আর্নেস্ট ময়র (Ernst Mayr)


মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা খুঁজে পাবার সুযোগ কোথায়?
এর উত্তর নিহিত আছে বেশিকিছু ধারাবাহিক সম্ভাবনার উপর। এই সমস্যাটি নিয়ে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি জার্নাল দেখেছিলাম। আমি এই লেখাটিকে ভিত্তি করে আমার বক্তব্য তুলে ধরব। এই লেখাটিতে যে সব বিষয় অন্বেষণ করা হয়েছে তা সত্যিই প্রণিধানযোগ্য। আমার চিন্তাপদ্ধতি বেশ কিছু ধারাবাহিক প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রশ্নগুলো SETI'র সফলতার সম্ভাবনাকে অনেকাংশে সীমিত করে দেয়।

মহাবিশ্বের কোথাও প্রাণ থাকা কি সম্ভব?
SETI প্রজেক্টের সবচেয়ে সন্দেহবাদী ব্যক্তিও এই প্রশ্নের আশাব্যাঞ্জক উত্তর দেবেন। জীবন সৃষ্টির জন্য কোষের প্রয়োজন। সাথে দরকার এ্যামিনো এসিড এবং নিউক্লিয়িক এসিড। দুটো রাসায়নিক পদার্থ একাধিক মহাকাশীয় ধুলিকণাতে পাওয়া গেছে। অতএব এটা সহজেই প্রণিধানযোগ্য যে জীবন মহাবিশ্বের অন্যকোথাও রূপ লাভ করেছে।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী জীবনের উদ্ভব হয়েছে ক্ষুদ্রতম একক কোষ থেকে। যে কোনখানে স্বাধীনভাবে জীবন সৃষ্টির এটাই সবচাইতে সম্ভাব্য সমাধান। এ ধরণের স্বকীয় জীবন সৃষ্টির সম্ভাবনা পৃথিবীর চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা রকমের বিরূপ আবহাওয়াতেও সম্ভব।

কোথায় জীবন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে?
হ্যাঁ, গ্রহগুলো তো অবশ্যই। আমাদের নিজের নয়টা গ্রহ সম্পর্কে তো বিস্তারিত জানি। সন্দেহ করার কোন অবকাশ নাই যে সব গ্যালাক্সিতে লক্ষ, লক্ষ, বিলিয়ন, বিলিয়ন গ্রহ আছে। আসলে আমরা নিজেদের গ্যালাক্সিকে শুধু কল্পনা করতে পারি।

কতগুলো গ্রহ জীবন উপযোগী বলে বিবেচিত হতে পারে?
কোন কোন গ্রহতে প্রাণের সূচনা ও লালিত হবার সুযোগ খুব কম। আবহাওয়া সহনশীল গড় তাপমাত্রার থাকতে হবে। ঋতুর পরিবর্তনের প্রভাব সহ্যসীমার মধ্যে থাকতে হবে। সূর্য থেকে নিরাপদ দূরে থাকতে হবে। গ্রহটার অবশ্যই পরিমাপমত ভর থাকতে হবে। তার পরিমান এমন হতে হবে যেন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে। নতুন প্রাণের উদ্বোধনকে স্বাগত জানানোর জন্য আবহাওয়ামণ্ডলে সঠিক পরিমাণে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ থাকতে হবে। নববিকশিত প্রাণকে মহাজাগতিক আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ও অন্যান্য ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা করার জন্য সঠিক ঘনত্বের হতে হবে। আর অবশ্যই এ ধরণের গ্রহে জল থাকতে হবে।

সৌরজগতের নয়টা গ্রহের মধ্যে এই সব উপাদানের সঠিক সমন্বয় ঘটেছে মাত্র একটা গ্রহে। এটা আমি নিশ্চিত যে শুধুমাত্র হঠাৎ করে এমনটা ঘটে গেছে। অন্য সৌরজগতের কত ভাগ গ্রহের আবহাওয়া মণ্ডলে রাসায়নিক দ্রব্যের এমন সঠিক মিশ্রণ আছে। দশের মধ্যে এক, একশতর মধ্যে এক অথবা এক লক্ষের মধ্যে এক ভাগ, আপনারা কত ভাগ আশা করেন? একটি মাত্র উদাহরণকে সামনে রেখে সীমাহীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা সত্যিই কঠিন। উপরে উল্লিখিত ভগ্নাংশগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মহাবিশ্বের খুব কম গ্রহ সেটি প্রজেক্টের নাগালে রয়েছে। বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ হয়েছে এমন গ্রহের শতকরা হার কত ধরা উচিত?

পদার্থবিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জীববিজ্ঞানীদের চাইতে ভিন্ন উত্তর দেবে। তারা প্রাণীবিজ্ঞানীদের চাইতে আরও নিখুঁতভাবে বর্ণনা দেবেন। তারা এটা বলে অভ্যস্ত যে, যদি কোন প্রাণের উদ্ভব ঘটে, তাহলে তা অবশ্যই বুদ্ধিজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা এ ধরণের অগ্রগতির অসম্ভাব্যতা নিয়ে বরং বিস্মিত।

পৃথিবীতে জীবনের সৃষ্টি হয়েচে ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে। কিন্ত ৫ লক্ষ বৎসরের আগে উচ্চবুদ্ধির বিকাশ ঘটেনি। যদি পৃথিবী ওই ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর ধরে ঠাণ্ডা থাকত। কিংবা একটু বেশি গরম হত তাহলে বুদ্ধিমান প্রাণীর উদ্ভব কোনমতে সম্ভব হত না। এই প্রশ্নে উত্তর যখন খোঁজা হয়, তখন একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। পদার্থের নিয়ম অনুযায়ী বা রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে জীবন কখনও সোজাসুজি বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে যায়নি।

বিবর্তনের পথ খুবই জটিল। একটি গাছে যত শাখাপ্রশাখার বিন্যাস আছে তার চাইতেও জটিল। জীবনের উদ্ভবের পরপর অর্থাৎ ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে জীবন ২ বিলিয়ন বৎসর ধরে শুধু গঠিত হচ্ছিল। শুধু একটা সাধারণ প্রাথমিক নিউক্লিয়াস ছাড়া কোষ তৈরি হতে এতগুলো বৎসর লেগেছিল। এই ব্যাকটেরিয়ার মত বস্তুগুলো ৫০ থেকে ১০০টি ভিন্ন রকম (হয়তো আরও বেশি রকম) পথে বিকশিত হয়েছিল। এই বিশাল সময়ে তাদের কেউ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী হয়নি। বিস্ময়কর ব্যাপার হল এমন কি আজ পর্যন্ত এই ঘটনাকে আংশিকভাবে বর্ণনা করা হয়। ১,৮০০ মিলিয়ন বৎসর আগে সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য উচ্চতর বৈশিষ্ট্যের প্রত্যঙ্গ নিয়ে প্রথম Eukaryote গঠিত হয়। protists ভর্তি ওই পৃথিবী থেকে তিন ধরণের বহুকোষী জীবনের বিকাশ ঘটেছিল। ফাংগাই, উদ্ভিদ এবং প্রাণী। কিন্তু লক্ষ প্রকার ফাংগাই বা উদ্ভিদ কোন বুদ্ধিমত্তার জন্ম দিতে পারেনি।

প্রিক্যামব্রিয়ান এবং ক্যামব্রিয়ান যুগে প্রাণীরা (মেটাজোয়া) ৬০ থেকে ৮০টি ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। এর ধ্যে শুধুমাত্র কর্ডাটা প্রাণীরা সত্যিকারের বুদ্ধির অধিকারী হয়েছে। কর্ডাটা হল সবচেয়ে পুরাতন এবং বৈচিত্র্যময় দল। কিন্তু এই বিরাট সংখ্যক দল-উপদলের মধ্যে শুধুমাত্র Vertebrates রা বুদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। মাছ, এম্ফিবিয়ান, সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী নানারকমের উপদল নিয়ে এই ভারটেব্রা দল গঠিত। এর মধ্যে শুধুমাত্র একটি প্রকার স্তন্যপায়ীরা উচ্চমাত্রার বুদ্ধির অধিকারী হয়েছে। ট্রায়াসিক যুগ থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ীদের এক লম্বা ইতিহাস আছে। কিন্তু টারসিয়ারি যুগের শেষে অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন বৎসর আগে স্তন্যপায়ীদের ২৪ প্রজাতির মধ্যে মাত্র একটির মধ্যে বুদ্ধির উদ্ভব ঘটেছে।

প্রায় ৩ মিলিয়ন বৎসর আগে হোমিনিডদের মাথায় মগজের পরিমাণ বাড়তে থাকে। হোমো সেপিয়েন্সদের সুষুন্মাকাণ্ড (Cortex) তৈরি হয় ৩০০০০০০ বৎসর আগে। মিলিয়ন মিলিয়ন শাখা প্রশাখার বুদ্ধি অর্জনের ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে উচ্চমাত্রার বুদ্ধির অধিকারী হওয়া সত্যিই কঠিন। জীবনের উদ্ভব থেকে আজ পর্যন্ত কতগুলো প্রজাতি টিকে আছে? আমাদের গ্যালাক্সিতে যতগুলো গ্রহ আছে তার সংখ্যার চেয়েও বেশি। যদি এর অন্তত মিলিয়ন প্রজাতি জীবিত থাকে আর প্রত্যেকের টিকে থাকার গড় সময় যদি ১০০০০০ বৎসর হয়, তাহলে তার সংখ্যা বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। হয়তো জীবনের সূচনা থেকে ৫০ বিলিয়ন প্রজাতির চেয়েও বেশি প্রাণীর জন্ম হয়েছিল। সভ্যতা গড়তে পারার মত বুদ্ধি এদের মধ্যে মাত্র একটি প্রজাতি অর্জন করতে পেরেছে। আসলে প্রাণীদের মধ্যে এত বেশি বিচিত্রতা ছিল যে সঠিক হিসাব বের করা খুব কঠিন। এক বিশাল সংখ্যক প্রজাতির জন্ম ও বিকাশ হয়েছি। প্যালেন্টলজিস্টরা দেখেছেন বেশি ছড়িয়ে পরা, জনবহুল প্রজাতিগুলো লক্ষ লক্ষ বৎসর বেঁচে ছিল। এর সবগুলো আসলে অনন্য ঘটনা নয় বরং অস্বাভাবিক ঘটনা।

উচ্চমাত্রার বুদ্ধি খুঁজে পাওয়া দুস্কর কেন?
সুনির্বাচিত অভিযোজনগুলো যেমন 'চোখ' স্বাধীনভাবে শক্তিশালী হয়েছে। উচ্চমাত্রার বুদ্ধি শুধু একবার তৈরি হয়েছে। শুধুমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে। এই অসাধারণ ঘটনার স্বপক্ষে আমি মাত্র দুইটা কারণ দেখতে পারছি। প্রথমত প্রাকৃতির নির্বাচন দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তি সবসময় আনুকূল্য পায় না। অন্তত: আমরা যেমন আশা করি তেমন নাও ঘটতে পারে। আসলে অন্য সব ধরণের জীবিত প্রাণী তথা লক্ষ লক্ষ প্রজাতির উচ্চমাত্রার বুদ্ধি ছাড়াই ভাল আছে।

মানুষের প্রকার শিম্পাঞ্জীর প্রকার থেকে ৫ মিলিয়ন বৎসর আগে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ৩০০০০০ বছরের আগে মানুষের মগজ বড় হয়নি। স্ট্যানলি'র (১৯৯২) মতে বুদ্ধির বিকাশের শেষ পর্যায়ে অসহায় বাচ্চাকে বহন করার জন্য মায়েদের হাতের তৈরি হওয়া প্রয়োজন ছিল। বেশি বুদ্ধির জন্য বড় মগজ প্রয়োজন। হোমিনিড প্রজাতিদের মগজ জীবন পরিক্রমার শেষ ৬ ভাগেরও কম সময়ে বিকশিত হয়েছে। এতে মনে হয় উন্নত মানের বুদ্ধি তৈরির জন্য কিছু অনুকূল উপাদানের এক বিরল মিশ্রণ এর প্রয়োজন (Mayr 1994)।

সভ্যতা সৃষ্টির জন্য কি পরিমাণ বুদ্ধির প্রয়োজন?
আমরা জানি প্রাথমিক স্তরের কিছু বুদ্ধি ইতিমধ্যে পাখি (দাঁড়কাক, তোতা) এবং কিছু স্তন্যপায়ী (মাংশাসী, শুশুক, বানর) এবং এ ধরণের যারা আছে তাদের মধ্যে পাওয়া গেছে। কিন্তু এদের মধ্যে কেউ সভ্যতা তৈরি করার মত বুদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।

সব সভ্যতাই কি মহাশূন্যে বেতার তরঙ্গ নিক্ষেপ করতে বা মহাশূন্য থেকে আসা তরঙ্গ গ্রহণ করতে সক্ষম?
এর সোজাসুজি উত্তর হল 'না'। গত ১০,০০০ বৎসরে পৃথিবীতে কমপক্ষে ২০টি সভ্যতা এসেছিল। ভারতীয়, সুমেরীয়সহ নিকট অতীতে প্রাচ্যসভ্যতাসমূহ, প্রাচীন মিশর, গ্রিক এবং সমস্ত ইউরোপীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে মায়া, আজটেক, ইনকা এবং বিভিন্ন রকমের চৈনিক বা ভারতীয় সভ্যাতার কোনটি এতদূর অগ্রসর হতে পারেনি। এদের মধ্যে মাত্র একটি সভ্যতা প্রযুক্তিকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে যে তারা মহাকাশে বেতার তরঙ্গ নিক্ষেপ করতে এবং মহাকাশ থেকে আসা বেতার তরঙ্গ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে।


ভিন্নগ্রহের প্রাণীদের ইন্দ্রিয় কি আমাদের পাঠানো তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ বুঝতে পারবে?
নিশ্চিতভাবে এর নাবোধক উত্তর দেয়া যায়। পৃথিবীতেও এমন কিছু শ্রেণী আছে যাদের শ্রবণশ্তি বেশ উঁচু মাত্রার কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক প্রভাবে তারা অতিদ্রুত সাড়া দেয় কিন্তু তারা কোন তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কোন উদ্ভিদ এমনকি কোন ছত্রাকও বৈদ্যুতিক তরঙ্গকে গ্রহণ করে না। যদি অন্য কোন গ্রহে কোন উচ্চশ্রেণীর প্রাণী থেকেও থাকে তাহলে তাদের জৈবিক অগ্রগতি আমাদের চাইতে খুব বেশি কিছু হবে না।

কোন সভ্যতা ঠিক কতদিনব্যাপী তরঙ্গ গ্রহণে সক্ষম হবে?
প্রত্যেক সভ্যতার জীবনকাল কম হয়। এ বিষয়টার উপর জোর দিয়ে একটি ছোট্ট গল্প বলি।
ধরি, আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে কোন গ্রহে সত্যিই কোন বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। শত কোটি বৎসর আগে তাদের মহাকাশবিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে আবিষ্কার করল। তারা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বলল যে, এই গ্রহটি প্রাণের বিকাশের জন্য সবদিক দিয়ে উপযুক্ত। এই ধারণা পরীক্ষা করার জন্য তারা শতকোটি বৎসর ধরে পৃথিবীতে বিভিন্ন সিগন্যাল পাঠাল। কিন্তু কোন উত্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১৮০০ সালে (আমাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী) তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, আর মাত্র ১০০ বৎসর সিগন্যাল পাঠানো হবে। ১৯০০ সালের মধ্যে কোন উত্তর না পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে পৃথিবীতে কোন বুদ্ধিমান প্রাণী নেই। এভাবে ভাবলে দেখা যায় যে সত্যিই যদি মহাবিশ্বে হাজার হাজার সভ্যতা থেকেও থাকে তাহলেও তাদের সাথে সফল যোগাযোগের সম্ভাবনা খুব কম। আসলে "খোলা দুয়ারের স্থায়ীত্ব বড়ই ক্ষীণ"।

সকলেই জানেন যে সেটি'র বিস্তৃতিশক্তি ততোটা বেশি না। সেটি নিক্ষেপিত সিগন্যাল আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সির সীমানার মধ্যেই থাকে। কিন্তু সত্যি ঘটনা হল মহাবিশ্বে আরও অসংখ্য সংখ্যক সমান বৈশিষ্ট্যের গ্যালাক্সি আছে। সেটি প্রজেক্টের এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতা সত্ত্বেও এখনও এই গ্যালাক্সিগুলোর নিকটবর্তী হতে পারেনি।

উপসংহার
এই যুক্তি ও বিশ্লেষণ থেকে আমরা কি উপসংহার টানতে পারি? আলোচিত শর্তগুলোর আটটার মধ্যে ছয়টার বেশি পূরণ করা সেটি'র জন্য পুরোপুরি অসম্ভব। আর যদি এই শর্তগুলো ছয়টার কয়েকগুণ বেশি হয় তাহলে সেটি'র অসম্ভাব্যতা মহাবিশ্বের সীমার সমান হয়ে পড়বে।

তা সত্ত্বেও সেটি'কে এখনও প্রস্তাব করা হচ্ছে কেন?
কেউ যদি খোঁজ করে তাহলে দেখবে যে সেটি'র সাথে যারা জাড়িত তারা কেউ মহাকাশবিজ্ঞানী, কেউ পদার্থবিদ আবার কেউ বা প্রযুক্তিবিদ। সেটি'র সাফল্য যে কোন পদার্থবিদ্যার সূত্র বা প্রযুক্তির নিয়মের উপর নির্ভর করে না এ বিষয়ে তারা সচেতন নন। সেটি'র উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে জীববৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সেটি প্রজেক্টের যে কোন সম্ভাব্য সাফল্য বাস্তবের মুখ দেখবে না।


আর্নেস্ট মেয়রঃ শতকের অন্যতম প্রধান জীববিজ্ঞানী। তিনি প্রাণীবিজ্ঞানের Alexander Agassiz অধ্যাপক। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। ৬৫০টি পেপার এবং ২০টি বই লিখেছেন। পাখিবিজ্ঞান এবং শ্রেণীবিন্যাস বিদ্যা বিশারদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত। বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। তিনি সাধারণত জনসংখ্যা ও জীববৈচিত্রের ভিত্তিতে প্রজাতির উন্নয়ন বিষয়ে লেখালেখি করেন। সম্প্রতি তিনি সেটি (SETI) বিষয়েও লেখালেখি শুরু করেছেন।

মূললেখা
Read More ... »
 
-:-