Aug 30, 2009

সেটি কি সফল হবে? মনে হয় না?

Can SETI Succed?
সেটি কি সফল হবে?
অনুবাদ: সুশান্ত বর্মন

মনুষ্যত্বের সীমা ও সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের কোন সংশয় ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সে চিন্তায় পরিবর্তন এনেছে। প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে প্রযুক্তির নিয়মগুলোকে আমরা অনেকাংশে চিনতে পারছি। কিন্তু তাও যথেষ্ট নয়। কারণ ভিন্নগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা আমাদের মনে নতুন আশার বীজ বপন করেছে। মহাজাগতিক সভ্যতা আছে কি নেই তার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। মানুষের বোধগম্য হতে পারে এমন তথ্য খোঁজার ভার য়েছে SETI (SEARCH FOR EXTRA TERRESTRIAL INTELIGENT) মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার অন্বেষণ প্রকারান্তরে আমাদের নিজেদেরকে খোঁজার একটি চেষ্টা। এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা? আর কোথাও কি প্রাণের বিকাশ হয় নি। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সভ্যতা কি মানুষের নিজস্ব আবিষ্কার? সভ্যতা ও প্রযুক্তিতে আমাদের চেয়ে উন্নততর প্রাণী কি আর কোথাও নেই? লক্ষকোটি তারার মাঝে একটিতেও কি প্রাণীরা কোন সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলেনি? এরকম বহুবিধ প্রশ্ন দ্বারা নিরন্তর তাড়না থেকে জন্ম হয়েছে সেটি'র।

১৯৫৯ সালের একটি গবেষণাপত্রে গসিপি কোকোনি (Giussepe Cocconi) এবং ফিলিপ মরিসন (Philip Morrison) সেটি'র কল্পনাকে প্রকাশ করেন। সেটি'র মূল দর্শন জন্ম হয় এই গবেষণাপত্র থেকে। সেখানে লেখা ছিল -"যথাযথ পরিবেশ ও বস্তজগতের নিয়মের প্রেক্ষিতে একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ফলাফল হল জীবন। বস্তুজাগতিক পরিবর্তনের চলমানতা পৃথিবীতে যেমন নিজস্ব লয়ে চলছে ঠিক তেমন একইভাবে অন্য সব জায়গায় চলার কথা।" আমাদের নিজস্ব ছায়াপথে কোটি কোটি তারা রয়েছে। আমরা কোটি কোটি ছায়াপথের মাঝে মাত্র একটিতে বাস করি। সুতরাং এই মহাবিশ্বের প্রান্তরে প্রান্তরে জীবনের সম্ভাবনা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। নিশ্চয় এমন অনেক স্বাভাবিক আবাসস্থল আছে যেখানে বিশাল জ্ঞাতিগোষ্ঠী নিয়ে জীবন্ত প্রাণীরা বাস করছে। এর মধ্যে কোন কোন আবাসস্থলে হয়তো বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটেছে। প্রযুক্তিকেও হয়তো তারা করায়ত্ব করেছে। যেহেতু তারা বুদ্ধিমান, সেহেতু তারা অন্য বুদ্ধিমান প্রাণীদের সাথে নিশ্চয় যোগাযোগ করতে আগ্রহী।

বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে আন্ত:নাক্ষত্রিক যোগাযোগ তৈরি করা যায়। এই তরঙ্গের মাধ্যমে সমগ্র ছায়াপথে অতি সহজে তথ্য আদানপ্রদান করা সম্ভব। কোন কোন মহাজাগতিক সভ্যতা হয়তো বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় স্বাক্ষর দিয়ে নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে চায়। আমাদের তা পড়তে পারা উচিত।

কিন্তু ভিনগ্রহবাসীর উপস্থিতির স্বপক্ষে আজ পর্যন্ত একটা নিখুঁত প্রমাণ আমরা সংগ্রহ করতে পারিনি। যারা মনে করেন এই মহাবিশ্বে প্রযুক্তিগত সভ্যতা একমাত্র মানুষের করায়ত্ব তারাও নিশ্চুপ থাকছেন না। ফলে ভিনগ্রহবাসীর উপস্থিতির স্বপক্ষের আশাবাদী এবং বিপক্ষের নিরাশাবাদী এই দুইরকম তত্ত্বাবলম্বীদের মধ্যে একটা তাত্ত্বিক বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে।

আমরা আজ ভিনগ্রহে প্রাণের উপস্থিতি সম্পর্কে একটি বিতর্ক পাঠ করব। এতে বিষয়টিকে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক দুই দিক থেকেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমে আমরা জানব আর্নেস্ট মেয়র (Ernst Mayr) এর বক্তব্য। তিনি বিংশ শতকের সবচাইতে প্রসিদ্ধ বিবর্তনবাদী বিশেষজ্ঞ। তিনি হার্ভার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক জীববিজ্ঞান জাদুঘরের কর্মকর্তা। তাঁর প্রধান বক্তব্য অনন্য মতবাদের উপর। মেয়র নির্দিষ্ট করে বলেন যে ঘটনার শুরু থেকেই বিভিন্ন রকমের অনন্যতা সেটি'র প্রধান সমস্যা। এর বিপরীতে প্লানেটরি সোসাইটি'র (Planetary Society) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় (Cornell University) এর মহাকাশ চর্চা কেন্দ্রের কার্ল সাগান বক্তব্য দিয়েছেন আশাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। কোন দৃষ্টিকোণ সহজপাচ্য তা জানতে হলে পড়তে থাকুন এবং নিজেই সিদ্ধান্ত নিন।

SETI (সেটি) কি সফল হবে? মনে হয় না?
আর্নেস্ট ময়র (Ernst Mayr)


মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা খুঁজে পাবার সুযোগ কোথায়?
এর উত্তর নিহিত আছে বেশিকিছু ধারাবাহিক সম্ভাবনার উপর। এই সমস্যাটি নিয়ে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি জার্নাল দেখেছিলাম। আমি এই লেখাটিকে ভিত্তি করে আমার বক্তব্য তুলে ধরব। এই লেখাটিতে যে সব বিষয় অন্বেষণ করা হয়েছে তা সত্যিই প্রণিধানযোগ্য। আমার চিন্তাপদ্ধতি বেশ কিছু ধারাবাহিক প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রশ্নগুলো SETI'র সফলতার সম্ভাবনাকে অনেকাংশে সীমিত করে দেয়।

মহাবিশ্বের কোথাও প্রাণ থাকা কি সম্ভব?
SETI প্রজেক্টের সবচেয়ে সন্দেহবাদী ব্যক্তিও এই প্রশ্নের আশাব্যাঞ্জক উত্তর দেবেন। জীবন সৃষ্টির জন্য কোষের প্রয়োজন। সাথে দরকার এ্যামিনো এসিড এবং নিউক্লিয়িক এসিড। দুটো রাসায়নিক পদার্থ একাধিক মহাকাশীয় ধুলিকণাতে পাওয়া গেছে। অতএব এটা সহজেই প্রণিধানযোগ্য যে জীবন মহাবিশ্বের অন্যকোথাও রূপ লাভ করেছে।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী জীবনের উদ্ভব হয়েছে ক্ষুদ্রতম একক কোষ থেকে। যে কোনখানে স্বাধীনভাবে জীবন সৃষ্টির এটাই সবচাইতে সম্ভাব্য সমাধান। এ ধরণের স্বকীয় জীবন সৃষ্টির সম্ভাবনা পৃথিবীর চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা রকমের বিরূপ আবহাওয়াতেও সম্ভব।

কোথায় জীবন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে?
হ্যাঁ, গ্রহগুলো তো অবশ্যই। আমাদের নিজের নয়টা গ্রহ সম্পর্কে তো বিস্তারিত জানি। সন্দেহ করার কোন অবকাশ নাই যে সব গ্যালাক্সিতে লক্ষ, লক্ষ, বিলিয়ন, বিলিয়ন গ্রহ আছে। আসলে আমরা নিজেদের গ্যালাক্সিকে শুধু কল্পনা করতে পারি।

কতগুলো গ্রহ জীবন উপযোগী বলে বিবেচিত হতে পারে?
কোন কোন গ্রহতে প্রাণের সূচনা ও লালিত হবার সুযোগ খুব কম। আবহাওয়া সহনশীল গড় তাপমাত্রার থাকতে হবে। ঋতুর পরিবর্তনের প্রভাব সহ্যসীমার মধ্যে থাকতে হবে। সূর্য থেকে নিরাপদ দূরে থাকতে হবে। গ্রহটার অবশ্যই পরিমাপমত ভর থাকতে হবে। তার পরিমান এমন হতে হবে যেন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে। নতুন প্রাণের উদ্বোধনকে স্বাগত জানানোর জন্য আবহাওয়ামণ্ডলে সঠিক পরিমাণে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ থাকতে হবে। নববিকশিত প্রাণকে মহাজাগতিক আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ও অন্যান্য ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা করার জন্য সঠিক ঘনত্বের হতে হবে। আর অবশ্যই এ ধরণের গ্রহে জল থাকতে হবে।

সৌরজগতের নয়টা গ্রহের মধ্যে এই সব উপাদানের সঠিক সমন্বয় ঘটেছে মাত্র একটা গ্রহে। এটা আমি নিশ্চিত যে শুধুমাত্র হঠাৎ করে এমনটা ঘটে গেছে। অন্য সৌরজগতের কত ভাগ গ্রহের আবহাওয়া মণ্ডলে রাসায়নিক দ্রব্যের এমন সঠিক মিশ্রণ আছে। দশের মধ্যে এক, একশতর মধ্যে এক অথবা এক লক্ষের মধ্যে এক ভাগ, আপনারা কত ভাগ আশা করেন? একটি মাত্র উদাহরণকে সামনে রেখে সীমাহীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা সত্যিই কঠিন। উপরে উল্লিখিত ভগ্নাংশগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মহাবিশ্বের খুব কম গ্রহ সেটি প্রজেক্টের নাগালে রয়েছে। বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ হয়েছে এমন গ্রহের শতকরা হার কত ধরা উচিত?

পদার্থবিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জীববিজ্ঞানীদের চাইতে ভিন্ন উত্তর দেবে। তারা প্রাণীবিজ্ঞানীদের চাইতে আরও নিখুঁতভাবে বর্ণনা দেবেন। তারা এটা বলে অভ্যস্ত যে, যদি কোন প্রাণের উদ্ভব ঘটে, তাহলে তা অবশ্যই বুদ্ধিজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা এ ধরণের অগ্রগতির অসম্ভাব্যতা নিয়ে বরং বিস্মিত।

পৃথিবীতে জীবনের সৃষ্টি হয়েচে ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে। কিন্ত ৫ লক্ষ বৎসরের আগে উচ্চবুদ্ধির বিকাশ ঘটেনি। যদি পৃথিবী ওই ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর ধরে ঠাণ্ডা থাকত। কিংবা একটু বেশি গরম হত তাহলে বুদ্ধিমান প্রাণীর উদ্ভব কোনমতে সম্ভব হত না। এই প্রশ্নে উত্তর যখন খোঁজা হয়, তখন একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। পদার্থের নিয়ম অনুযায়ী বা রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে জীবন কখনও সোজাসুজি বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে যায়নি।

বিবর্তনের পথ খুবই জটিল। একটি গাছে যত শাখাপ্রশাখার বিন্যাস আছে তার চাইতেও জটিল। জীবনের উদ্ভবের পরপর অর্থাৎ ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে জীবন ২ বিলিয়ন বৎসর ধরে শুধু গঠিত হচ্ছিল। শুধু একটা সাধারণ প্রাথমিক নিউক্লিয়াস ছাড়া কোষ তৈরি হতে এতগুলো বৎসর লেগেছিল। এই ব্যাকটেরিয়ার মত বস্তুগুলো ৫০ থেকে ১০০টি ভিন্ন রকম (হয়তো আরও বেশি রকম) পথে বিকশিত হয়েছিল। এই বিশাল সময়ে তাদের কেউ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী হয়নি। বিস্ময়কর ব্যাপার হল এমন কি আজ পর্যন্ত এই ঘটনাকে আংশিকভাবে বর্ণনা করা হয়। ১,৮০০ মিলিয়ন বৎসর আগে সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য উচ্চতর বৈশিষ্ট্যের প্রত্যঙ্গ নিয়ে প্রথম Eukaryote গঠিত হয়। protists ভর্তি ওই পৃথিবী থেকে তিন ধরণের বহুকোষী জীবনের বিকাশ ঘটেছিল। ফাংগাই, উদ্ভিদ এবং প্রাণী। কিন্তু লক্ষ প্রকার ফাংগাই বা উদ্ভিদ কোন বুদ্ধিমত্তার জন্ম দিতে পারেনি।

প্রিক্যামব্রিয়ান এবং ক্যামব্রিয়ান যুগে প্রাণীরা (মেটাজোয়া) ৬০ থেকে ৮০টি ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। এর ধ্যে শুধুমাত্র কর্ডাটা প্রাণীরা সত্যিকারের বুদ্ধির অধিকারী হয়েছে। কর্ডাটা হল সবচেয়ে পুরাতন এবং বৈচিত্র্যময় দল। কিন্তু এই বিরাট সংখ্যক দল-উপদলের মধ্যে শুধুমাত্র Vertebrates রা বুদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। মাছ, এম্ফিবিয়ান, সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী নানারকমের উপদল নিয়ে এই ভারটেব্রা দল গঠিত। এর মধ্যে শুধুমাত্র একটি প্রকার স্তন্যপায়ীরা উচ্চমাত্রার বুদ্ধির অধিকারী হয়েছে। ট্রায়াসিক যুগ থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ীদের এক লম্বা ইতিহাস আছে। কিন্তু টারসিয়ারি যুগের শেষে অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন বৎসর আগে স্তন্যপায়ীদের ২৪ প্রজাতির মধ্যে মাত্র একটির মধ্যে বুদ্ধির উদ্ভব ঘটেছে।

প্রায় ৩ মিলিয়ন বৎসর আগে হোমিনিডদের মাথায় মগজের পরিমাণ বাড়তে থাকে। হোমো সেপিয়েন্সদের সুষুন্মাকাণ্ড (Cortex) তৈরি হয় ৩০০০০০০ বৎসর আগে। মিলিয়ন মিলিয়ন শাখা প্রশাখার বুদ্ধি অর্জনের ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে উচ্চমাত্রার বুদ্ধির অধিকারী হওয়া সত্যিই কঠিন। জীবনের উদ্ভব থেকে আজ পর্যন্ত কতগুলো প্রজাতি টিকে আছে? আমাদের গ্যালাক্সিতে যতগুলো গ্রহ আছে তার সংখ্যার চেয়েও বেশি। যদি এর অন্তত মিলিয়ন প্রজাতি জীবিত থাকে আর প্রত্যেকের টিকে থাকার গড় সময় যদি ১০০০০০ বৎসর হয়, তাহলে তার সংখ্যা বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। হয়তো জীবনের সূচনা থেকে ৫০ বিলিয়ন প্রজাতির চেয়েও বেশি প্রাণীর জন্ম হয়েছিল। সভ্যতা গড়তে পারার মত বুদ্ধি এদের মধ্যে মাত্র একটি প্রজাতি অর্জন করতে পেরেছে। আসলে প্রাণীদের মধ্যে এত বেশি বিচিত্রতা ছিল যে সঠিক হিসাব বের করা খুব কঠিন। এক বিশাল সংখ্যক প্রজাতির জন্ম ও বিকাশ হয়েছি। প্যালেন্টলজিস্টরা দেখেছেন বেশি ছড়িয়ে পরা, জনবহুল প্রজাতিগুলো লক্ষ লক্ষ বৎসর বেঁচে ছিল। এর সবগুলো আসলে অনন্য ঘটনা নয় বরং অস্বাভাবিক ঘটনা।

উচ্চমাত্রার বুদ্ধি খুঁজে পাওয়া দুস্কর কেন?
সুনির্বাচিত অভিযোজনগুলো যেমন 'চোখ' স্বাধীনভাবে শক্তিশালী হয়েছে। উচ্চমাত্রার বুদ্ধি শুধু একবার তৈরি হয়েছে। শুধুমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে। এই অসাধারণ ঘটনার স্বপক্ষে আমি মাত্র দুইটা কারণ দেখতে পারছি। প্রথমত প্রাকৃতির নির্বাচন দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তি সবসময় আনুকূল্য পায় না। অন্তত: আমরা যেমন আশা করি তেমন নাও ঘটতে পারে। আসলে অন্য সব ধরণের জীবিত প্রাণী তথা লক্ষ লক্ষ প্রজাতির উচ্চমাত্রার বুদ্ধি ছাড়াই ভাল আছে।

মানুষের প্রকার শিম্পাঞ্জীর প্রকার থেকে ৫ মিলিয়ন বৎসর আগে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ৩০০০০০ বছরের আগে মানুষের মগজ বড় হয়নি। স্ট্যানলি'র (১৯৯২) মতে বুদ্ধির বিকাশের শেষ পর্যায়ে অসহায় বাচ্চাকে বহন করার জন্য মায়েদের হাতের তৈরি হওয়া প্রয়োজন ছিল। বেশি বুদ্ধির জন্য বড় মগজ প্রয়োজন। হোমিনিড প্রজাতিদের মগজ জীবন পরিক্রমার শেষ ৬ ভাগেরও কম সময়ে বিকশিত হয়েছে। এতে মনে হয় উন্নত মানের বুদ্ধি তৈরির জন্য কিছু অনুকূল উপাদানের এক বিরল মিশ্রণ এর প্রয়োজন (Mayr 1994)।

সভ্যতা সৃষ্টির জন্য কি পরিমাণ বুদ্ধির প্রয়োজন?
আমরা জানি প্রাথমিক স্তরের কিছু বুদ্ধি ইতিমধ্যে পাখি (দাঁড়কাক, তোতা) এবং কিছু স্তন্যপায়ী (মাংশাসী, শুশুক, বানর) এবং এ ধরণের যারা আছে তাদের মধ্যে পাওয়া গেছে। কিন্তু এদের মধ্যে কেউ সভ্যতা তৈরি করার মত বুদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।

সব সভ্যতাই কি মহাশূন্যে বেতার তরঙ্গ নিক্ষেপ করতে বা মহাশূন্য থেকে আসা তরঙ্গ গ্রহণ করতে সক্ষম?
এর সোজাসুজি উত্তর হল 'না'। গত ১০,০০০ বৎসরে পৃথিবীতে কমপক্ষে ২০টি সভ্যতা এসেছিল। ভারতীয়, সুমেরীয়সহ নিকট অতীতে প্রাচ্যসভ্যতাসমূহ, প্রাচীন মিশর, গ্রিক এবং সমস্ত ইউরোপীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে মায়া, আজটেক, ইনকা এবং বিভিন্ন রকমের চৈনিক বা ভারতীয় সভ্যাতার কোনটি এতদূর অগ্রসর হতে পারেনি। এদের মধ্যে মাত্র একটি সভ্যতা প্রযুক্তিকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে যে তারা মহাকাশে বেতার তরঙ্গ নিক্ষেপ করতে এবং মহাকাশ থেকে আসা বেতার তরঙ্গ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে।


ভিন্নগ্রহের প্রাণীদের ইন্দ্রিয় কি আমাদের পাঠানো তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ বুঝতে পারবে?
নিশ্চিতভাবে এর নাবোধক উত্তর দেয়া যায়। পৃথিবীতেও এমন কিছু শ্রেণী আছে যাদের শ্রবণশ্তি বেশ উঁচু মাত্রার কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক প্রভাবে তারা অতিদ্রুত সাড়া দেয় কিন্তু তারা কোন তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কোন উদ্ভিদ এমনকি কোন ছত্রাকও বৈদ্যুতিক তরঙ্গকে গ্রহণ করে না। যদি অন্য কোন গ্রহে কোন উচ্চশ্রেণীর প্রাণী থেকেও থাকে তাহলে তাদের জৈবিক অগ্রগতি আমাদের চাইতে খুব বেশি কিছু হবে না।

কোন সভ্যতা ঠিক কতদিনব্যাপী তরঙ্গ গ্রহণে সক্ষম হবে?
প্রত্যেক সভ্যতার জীবনকাল কম হয়। এ বিষয়টার উপর জোর দিয়ে একটি ছোট্ট গল্প বলি।
ধরি, আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে কোন গ্রহে সত্যিই কোন বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। শত কোটি বৎসর আগে তাদের মহাকাশবিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে আবিষ্কার করল। তারা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বলল যে, এই গ্রহটি প্রাণের বিকাশের জন্য সবদিক দিয়ে উপযুক্ত। এই ধারণা পরীক্ষা করার জন্য তারা শতকোটি বৎসর ধরে পৃথিবীতে বিভিন্ন সিগন্যাল পাঠাল। কিন্তু কোন উত্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১৮০০ সালে (আমাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী) তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, আর মাত্র ১০০ বৎসর সিগন্যাল পাঠানো হবে। ১৯০০ সালের মধ্যে কোন উত্তর না পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে পৃথিবীতে কোন বুদ্ধিমান প্রাণী নেই। এভাবে ভাবলে দেখা যায় যে সত্যিই যদি মহাবিশ্বে হাজার হাজার সভ্যতা থেকেও থাকে তাহলেও তাদের সাথে সফল যোগাযোগের সম্ভাবনা খুব কম। আসলে "খোলা দুয়ারের স্থায়ীত্ব বড়ই ক্ষীণ"।

সকলেই জানেন যে সেটি'র বিস্তৃতিশক্তি ততোটা বেশি না। সেটি নিক্ষেপিত সিগন্যাল আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সির সীমানার মধ্যেই থাকে। কিন্তু সত্যি ঘটনা হল মহাবিশ্বে আরও অসংখ্য সংখ্যক সমান বৈশিষ্ট্যের গ্যালাক্সি আছে। সেটি প্রজেক্টের এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতা সত্ত্বেও এখনও এই গ্যালাক্সিগুলোর নিকটবর্তী হতে পারেনি।

উপসংহার
এই যুক্তি ও বিশ্লেষণ থেকে আমরা কি উপসংহার টানতে পারি? আলোচিত শর্তগুলোর আটটার মধ্যে ছয়টার বেশি পূরণ করা সেটি'র জন্য পুরোপুরি অসম্ভব। আর যদি এই শর্তগুলো ছয়টার কয়েকগুণ বেশি হয় তাহলে সেটি'র অসম্ভাব্যতা মহাবিশ্বের সীমার সমান হয়ে পড়বে।

তা সত্ত্বেও সেটি'কে এখনও প্রস্তাব করা হচ্ছে কেন?
কেউ যদি খোঁজ করে তাহলে দেখবে যে সেটি'র সাথে যারা জাড়িত তারা কেউ মহাকাশবিজ্ঞানী, কেউ পদার্থবিদ আবার কেউ বা প্রযুক্তিবিদ। সেটি'র সাফল্য যে কোন পদার্থবিদ্যার সূত্র বা প্রযুক্তির নিয়মের উপর নির্ভর করে না এ বিষয়ে তারা সচেতন নন। সেটি'র উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে জীববৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সেটি প্রজেক্টের যে কোন সম্ভাব্য সাফল্য বাস্তবের মুখ দেখবে না।


আর্নেস্ট মেয়রঃ শতকের অন্যতম প্রধান জীববিজ্ঞানী। তিনি প্রাণীবিজ্ঞানের Alexander Agassiz অধ্যাপক। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। ৬৫০টি পেপার এবং ২০টি বই লিখেছেন। পাখিবিজ্ঞান এবং শ্রেণীবিন্যাস বিদ্যা বিশারদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত। বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। তিনি সাধারণত জনসংখ্যা ও জীববৈচিত্রের ভিত্তিতে প্রজাতির উন্নয়ন বিষয়ে লেখালেখি করেন। সম্প্রতি তিনি সেটি (SETI) বিষয়েও লেখালেখি শুরু করেছেন।

মূললেখা

0 টি মন্তব্য:

Post a Comment

 
-:-