Nov 10, 2008

ভাগ্য বা অদৃষ্টবাদ প্রসঙ্গে- ২য় অংশ

শিবাজি দে
সহকারী অধ্যাপক
আব্দুলপুর সরকারি কলেজ, নাটোর।

পূর্ব প্রকাশের পর......

মুসলিম ধর্মমতেও মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার প্রশ্ন, প্রজ্ঞা ও প্রত্যাদেশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব- এসব নিয়ে নানা মতের ফলে নানা সম্প্রদায়ের উদ্ভব দেখা যায়। বিশেষ করে অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস নিয়ে, পক্ষে ও বিপক্ষে দুটো চেতনা নিয়ে মুসলিম ধর্মতত্ত্বে দুটো পরস্পরবিরোধী সম্প্রদায়ের উদ্ভব দেখা যায়। এরা হলো- জাবারিয়া ও কাদারিয়া সম্প্রদায়।

জাহস বিন সাফাওয়ান (মৃত্যু- ৭৪৫) এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। আরবি জাবর শব্দ হতে জাবারিয়া শব্দের উদ্ভব। জাবর শব্দের অর্থ হচ্ছে বাধ্যতা, নিয়তি বা অদৃষ্ট। অদৃষ্টে বা আল্লাহর সর্বময় ইচ্ছায় বিশ্বাস করার জন্য এই সম্প্রদায় জাবারিয়া সম্প্রদায় নামে পরিচিত। তাদের মতে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ তার হাতের ক্রীড়নক মাত্র। জাবারিয়া সম্প্রদায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সর্বময় কর্তৃত্বের ক্ষমতার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। জাবারিয়াগণ সম্পূর্ণরূপে ইচ্ছার স্বাধীনতা অস্বীকার করেন। সব কাজ আল্লাহ্‌র নিকট হতে আসে। মানুষের কোন কার্য নির্বাচন করার ক্ষমতা বা শক্তি নাই। মানুষ আল্লাহর ইচ্ছার নিক সম্পূর্ণ অসহায়। জগতের প্রতিটি কার্য ও ঘটনা আল্লাহর নির্দেশে সংঘটিত হচ্ছে। মানুষের কোন ইচ্ছার স্বাধীনতা নেই। সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর সার্বভৌম শক্তির অধীন। মানুষের পুরস্কার ও শাস্তি আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার অন্তর্ভূক্ত। তিনি যাকে ইচ্ছা পুরস্কার দিবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। জাবারিয়া সম্প্রদায় তাদের মতবাদের সমর্থনে কোরআন থেকে কিছু আয়াতের উল্লেখ করেন। কয়েকটি আয়াত নিম্নে উল্লেখিত হলো-
(১) "আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন, কারণ তিনিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।" (সুরা-২, আয়াত-২৮৪)
(২) "তিনি যাকে ইচ্ছা সুপথে পরিচালনা করবেন।" (সুরা-২, আয়াত-২৭২)
(৩) "তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন এবং ভাগ্য নির্দেশ করে দিয়েছেন।" (সুরা-২৫, আয়াত ২২)

জাবারিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কাদারিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। কাদারিয়া সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদগণ মানুষের কার্যক্ষমতা এবং ইচ্ছার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। এদের মতে মানুষের কার্যক্ষমতা রয়েছে এবং তার সম্পাদিত কাজের জন্য সে নিজেই দায়ী। এরা অদৃষ্টবাদ সমর্থন করেন না; বরং বলেন মানুষ নিজেই তার কাজের কর্তা, নিয়ন্তা ও স্রষ্টা- মানুষ স্বেচ্ছায় ভাল বা মন্দ পথ অনুসরণ করে। মানুষের মধ্যে নীতিবোধ ও কর্তব্যবোধ রয়েছে, ফলে তার ইচ্ছার স্বাতন্ত্র্য ও কার্যের স্বাধীনতা রয়েছে। ভাল কাজ করলে সে পুরস্কার পাবে এবং মন্দ কাজ করলে শাস্তি পাবে। কাদারিয়া চিন্তাবিদগণ তাদের সমর্থনেও কোরআনের কিছু আয়াত নির্দেশ করেন। তার কয়েকটি আয়াত নিম্নে উল্লেখিত হলো-

(১) "যে ব্যক্তি পাপ করে, সে নিজ দায়িত্বেই তা করে। (সুরা-৪ , আয়াত- ১১১)
(২) "যে জাতি নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন করে না, আল্লাহও সে জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না। (সুরা- ১৩, আয়াত- ১৯)
(৩) "যে যেমন কাজ করবে সে অনুরূপ ফল পাবে।" "মানুষ চেষ্টার অতিরিক্ত ফল পাবে না।" "তোমাদের যে মুসিবত ঘটে তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।" (সুরা- ৪২, আয়াত- ৩০)

খ্রিস্টান ধর্মমতেও আমরা নানাভাবে অদৃষ্টবাদের সমর্থন লক্ষ্য করি। যিশুর জন্মের পূর্বেই জগতের ত্রাতা যিশুর আগমনের সংবাদ অনেকের কাছে পৌঁছে যায়। ঈশ্বরই একমাত্র সর্বমঙ্গলময় সর্বশক্তিমান এবং সব কার্যের নিয়ন্ত্রক। পবিত্র বাইবেলে আছে "তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দয়া করেন, এবং যাকে ইচ্ছা, তাকে কঠিন করেন।" ঈশ্বর তার ইচ্ছানুযায়ী মানুষকে পুরস্কার কিংবা শাক্তি দিবেন। যিশুর মাধ্যমে সত্যের পথে এলে মানুষ চির আনন্দের সূত্র খুঁজে পাবে।

প্রচলিত ধর্মমতগুলির মধ্যে বৌদ্ধ এবং জৈব মতগুলোকে অদৃষ্টবাদী বলা যায় না। মূলতঃ এই মতগুলো মানুষকে তাদের সাধনা এবং কর্মের মাধ্যমে নির্বাণ বা মোক্ষলাভের কথা বলে। জৈন মতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'স্যাৎবাদ', যা খুবই আগহোদ্দীপক। এই স্যাৎবাদের কথা বলো, বস্তুসত্ত্বা বহুমূখী বলে আমাদের বস্তু সম্পর্কে প্রতিনি উক্তিই সম্ভাবনামূলক। প্রতিটি অবধারণ আপেক্ষিক ও বিশ্লেষণমূলক। বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে প্রতিটি বিকল্প সম্ভাবনাকেই স্বীকারা করা যায়। চূড়ান্ত সত্য কি? এই প্রশ্নের কোন মীমাংসা নাই। বস্তুর প্রকৃতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে হ্যাঁ কিংবা না-বোধক যত বাক্যই উদ্ভাবন করি না কেন- সবই শর্তসাপেক্ষ এবং আপেক্ষিক। দেশ-কাল, দ্রব্য-পর্যায়, আকৃতি-প্রকৃতি প্রভৃতি অনেক ধরণের শর্ত আছে। সমস্ত যুক্তিবাক্যই এসব শর্তের অধীন। মূলতঃ জৈন-দর্শনে জ্ঞান ও সত্যের আপেক্ষিকতা এবং সম্ভাব্যতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এখানে অদৃষ্টবাদের মত কোন চূড়ান্ত সত্যের কথা বলা হয় না।

বৌদ্ধ ধর্মকথার মূল সত্য চারটি। এগুলো হলো----
(১) সকলই দুঃখময়।
(২) দুঃখের কারণ আছে।
(৩) দুঃখের নিরোধ সম্ভব।
(৪) দুঃখ নিরোধের সুনির্দিষ্ট উপায় আছে।

বুদ্ধ তার প্রজ্ঞা দ্বারা দেখেছিলেন, নাম রূপ সর্বস্ব এই জীবন অনিত্য, ক্ষণভঙ্গুর, অনাত্ম এবং দুঃখময়। অজ্ঞানতাই এই দুঃখের মূল কারণ। অবিদ্যাবশত মানুষ তাঁর প্রাকৃতিক বাসনা এবং সংস্কারের প্রভাবে পড়ে নিরন্তর জন্ম-মৃত্যুর ভবচক্রে আবর্তিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক বাসনা, কর্ম এবং সংস্কার কখনোই মানুষকে এই আবর্ত থেকে মুক্ত করে না। এই নৈরাশ্যবাদ থেকে মুক্তির উপায় নির্বাণলাভ। দুঃখ দৈন্য হতে সকল জীবের মুক্তির জন্য মৈত্রী ও করুণার দ্বারা একান্ত হৃদয়ে জীব সেবা করতে হবে। এভাবে দিব্য-অনুভব, অহিংসা কর্ম এবং নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে নাম-রূপ প্রবাহ নিরুদ্ধ হলেই নির্বাণ লাভ হয়। বুদ্ধমতেও মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় সমূহ চর্চা করে মুক্তিলাভের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। বুদ্ধমতে আশাবাদই গুরুত্ব পেয়েছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও সেইসাথে নিরীশ্বরবাদী নানা মত বস্তুবাদী ও বহুত্ববাদী নানা দর্শনের প্রভাবে বর্তমানে সরাসরি অদৃষ্টবাদে সমর্থন (বিশেষভাবে বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে) কম দেখা যায়। বর্তমানে অনেকেই জ্যোতিষবিদ্যা বিশ্বাস করে না। তাছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আওতায় আসার যে শর্তাবলী তা না থাকায় জ্যোতিষবিদ্যা বিজ্ঞানের বাইরে প্রক্ষিপ্ত হয়। এসময়ে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য মতবাদ হিসেবে সম্ভাব্যতা অথবা আকস্মিকতার কথা মেনে নেয়া হয় পরিসংখ্যান বিদ্যার মাধ্যমে ঘটনাবলীর সাধারণ সূত্র নির্মাণে অনেকটাই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। বিজ্ঞানের দিক দিয়েও আপেক্ষিক সত্যকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। আধুনিক দর্শনেও অনেক অজ্ঞেয়বাদী মতবাদ দেখা যায়। ডারউইনের বিবর্তনবাদে আকস্মিকতার কথাই বলা হয়েছে। ডারউইনের মতে, জটিল জীবকোষগুলোতে আকস্মিক ও স্বতঃস্ফুর্ত পরিবতন দেখা দেয়, যার জন্য জীবদেহেরও পরিবর্তন দেখা দেয়। জীবকোষের আকস্মিক পরিবর্তন বংশানুক্রমে সংক্রমিত হয়। এই পরিবর্তন দেহের অনুকুল হলে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকা যায়, আর প্রতিকুলে হলে সে জাতি ধ্বংস হয়। জীবন সংগ্রামে জয়ীরা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যবিধান করে বেঁচে থাকে। তারাই যোগ্যতম। এভাবেই প্রকৃতিতে প্রাণীকূলের বিবর্তন এগিয়ে চলেছে। আবার হেনরী বার্গসও অন্যভাবে আকস্মিকতার কথা বলেন। তাঁর মতে প্রাণ-প্রবাহ হলো একমাত্র সত্তা। প্রাণপ্রবাহ অখণ্ড, অবিভাজ্য এবং গতিশীল। এর কোন ছেদ নেই। চলাই হচ্ছে এর মূলমন্ত্র। গতিই হচ্ছে নিখিল বিশ্বের চিরন্তন সত্য। প্রাণপ্রবাহ তার চলার পথে কেবল সৃষ্টি করে যায়। এ সৃষ্টি অতীত বা ভবিষ্যৎ কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। আবার মানবতাবাদীরা (প্রটোগোরাস থেকে মার্ক্স, রাসেল প্রমুখ) অন্যভাবে অদৃষ্টবাদকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তাদের মতে মানবকল্পিত ঈশ্বরে সর্বজ্ঞতা, সর্বশক্তিময়তা এবং অনন্ত করুনা আরোপ করলে মানুষের উপর নানাভাবে ব্যাপক অন্যায়, অপচয় এবং দুঃখের ব্যাখ্যা দেয়া দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে, শুধু তাই নয় ইতিহাসে এবং সমকালে মানুষের প্রত্যক্ষ দুরবস্থার কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজন মানুষের প্রত্যক্ষ দুরবস্থার কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজন মানুষের কল্যাণে পরিবর্তন এবং তার দুঃখের কারণ নির্ণয় করে সেগুলোর অপসারণ। আধুনিক যুগে এসে প্রায় সবগুলো মতেই নিয়তিবাদ বা অদৃষ্টবাদের প্রভাব তাত্ত্বিকভাবে একেবারে নিঃশেষ হয়ে এসেছে। তবে মানুষ যে তার স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে পারে না, ভাগ্যের অধীনে না হলেএ - অন্যান্য প্রাকৃতিক শর্তাবলীর অধীনে, তা সব মতবাদই কোন না কোনভাবে মেনে নেয়।

ধর্মমতসমূহে, পুরাণগুলোতে কার্বে সাহিত্যে, অদৃষ্টবাদের নানা সমর্থন থাকলেও অতীতে অনেকে এর বিরোধীতা করেছে। আজকের যুগে তো কথাই নেই। ভারতীয় চার্বাকরা কিংবা গ্রীক বস্তুবাদীরা প্রাচীন যুগেই নিয়তিবাদের বিরোধীতা করেছে। মানুষ অদৃষ্টে বিশ্বাস করলেও তার মধ্যে এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে বলেই সে জীবন চালানোর জন্য বা বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে। মানুষ তাদের নিজেদের এবং সমাজের উন্নয়নের জন্য খুব কঠিন বা কষ্টকর পদক্ষেপও নেয়। শুধু ভাগ্যের আশায় বসে থাকে না। সত্যিকারে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভাগ্যে বিশ্বাস কর্মত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়- যা থেকে দায়িত্বহীনতা দেখা দেয়।

আমেরিকান সাহিত্যেক জেমস. এ. পাইক নিয়তিবাদের সমালোচনা করতে গিয়ে ধর্মীয় স্বর্গ-নরক ধারণার একটি সকৌতুক ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে,
সম্পূর্ণ পূণ্যের অবস্থা আরেকটি সম্পূর্ণ পাপের অবস্থা এই দুই সম্পূর্ণ অন্তহীন বিরোধী অবস্থার যে কোন একটি পরম স্তরেই ব্যক্তি থাকতে পারবে। এই সম্পূর্ণ পূণ্যের অবস্থাই হলো স্বর্গ। এই স্বর্গে যাওয়ার জন্য প্রার্থীদের যেসব গুণাবলী দেখাতে হয় তার একটি প্রধানগুণ হলো পরার্থপরতা বা নিঃস্বার্থ ভালবাসা। প্রশ্ন হলো একজন মৈত্রী করুণাভাবাপন্ন পরার্থপর মানুষ কিভাবে স্বর্গে বাস করতে পারে, যেখান থেকে ঈশ্বর স্থায়ীভাবে অন্যদের বাইরে রেখেছে। যাদের নিজেদের পরিবর্তন করার কোন সুযোগ নেই বা পরিতৃপ্তির কোন আশা নেই। তাই স্বর্গীয় সেসব মহান এবং মহৎ ব্যক্তিদের বিবেক কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে যা থেকে তারা মহান ঈশ্বরের সামনে প্রতিবাদ জানাতে পারে অথবা আরো বেশীকিছু, যেমন নরকবাসীদের সেখান থেকে উদ্ধারের জন্য উদ্ধার দল (Rescue party) তৈরি করতে পারে।
---- এই সমালোচনাটি আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে ভাবার্থ করলে দাঁড়ায় যে অদৃষ্টবাদ মেনে নিলে ঈশ্বর সর্বক্ষমতাময় হয়েও কাউকে পূণ্যের পথে, কাউকে পাপের পথে কেনই বা চালাবেন, কেনই বা তিনি শাস্তির মত অমানবিক কাজ করবেন, কেনই বা তা বিবেকবান মানুষ মেনে নেবে। এজন্যই অদৃষ্টবাদীরা ব্যক্তির যে কোন অবস্থাকেই ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে মেনে নেয়ার কথা বলে এবং প্রতিরোধকে অনুৎসাহিত করে (ব্যতিক্রম আছে)।

প্রকৃতপক্ষে, যৌক্তিক বা বিচারবিশ্লেষণ ভিত্তিক আলোচনায় অদৃষ্টবাদ মেনে নেয়া যায় না। তারপরও প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র অংশ হিসাবে মানুষ অসহায়। ব্যক্তি মানুষের নানা ক্ষুদ্রতা, ব্যর্থতা, সসীমতা, অন্যদিকে তার আশা, পূর্ণতাবোধ, অসীমতার ধারণা সব মিলিয়ে কোন না কোনভাবে ভাগ্য বা নিয়তির কথা কোন না কোন সময় বিশ্বাস করে ফেলে, বিশেষ করে জটিল বা সংকটজনক অবস্থায়। স্বামী বিবেকানন্দ তার 'মায়া' বিষয়ক আলোচনায় বলেছিলেন -
"প্রত্যেক বালক জন্ম হইতেই আশাবাদী; সে সুখের স্বপ্নই দেখে। যৌবনে সে অধিকতর আশাবাদী হয়। মৃত্যু, পরাজয় বা অপমান বলিয়া কিছু আছে- কোন যুবকের পক্ষে ইহা বিশ্বাস করা কঠিন। বৃদ্ধাবস্থা আসিল- জীবন ধ্বংসরাশিতে পরিণত হইল, সুখস্বপ্ন আকাশে বিলীন হইল; বৃদ্ধ নৈরাশ্যবাদ অবলম্বন করিলেন। এইরূপে আমরা প্রকৃতি তাড়িত হইয়া আশাশূন্য ও উদ্দেশ্যহীনের মতো এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্তে ধাবিত হইতেছি।"
মানুষ সময়ে সাথে সাথে যখন ভীষণ প্রতিরোধের সামনে পড়ে, তখন কোন না কোনভাবে অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়ে। তাছাড়া, আমাদের সামাজিক ও ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির মধ্যে থেকে কিছুটা হলেও শিশুকাল থেকেই অধিকাংশের মনে অদৃষ্টবাদের বীজ বপন হয়ে যায়। কজনেই আর বার্ট্রান্ড রাসেল বা হুমায়ূন আজাদের মতো নিরাপোষ যুক্তিবাদী থাকতে পারে জীবনের শেষ পর্বেও।

হয়তো অদৃষ্টই আমাকে এ লেখা লেখাচ্ছে। আবার হয়তো স্বাধীন ইচ্ছা দ্বারা স্থির হয়েই লেখাটা লিখছি। যে যেভাবে ইচ্ছা বলতে পারে। তবে, ভাবনা যেভাবেই হোক; কল্যাণ কামনা নিয়ে আনন্দচিত্তে কর্ম করে যাওয়াটাই দরকার। ভাগ্যের ভরসায় ভাগ্যে বিশ্বাসীরাও বসে থাকে না। বরং ভাগ্যে বিশ্বাসের কথা বলে অন্যকে প্রতারিত করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়ার লোকের অভাব নেই। ভাগ্যে বিশ্বাস করে নিশ্চল হয়ে থাকার চেয়ে যতক্ষণ শক্তি আছে, বুদ্ধির সাহায্যে এগিয়ে চলাই শ্রেয়- তাতে ভাগ্যও হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সহায় হয়। তাই অদৃষ্টবাদ, মতবাদ হিসেবে শুধু পড়ে যাওয়াই ভালো- মনে বা কাজে একে স্থান দেয়া সমীচিন নয়।

----##----
Read More ... »
 
-:-