এ. এন. রাশেদা
৩৫০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীপৃষ্ঠে আদিমতর উদ্ভিদ জীবনের শুরু হয়েছে বলে মনে করা হয়। সালোক - সংশ্লেষণকারী আদিমতর উদ্ভিদের উৎপত্তির ফলেই প্রাণিজগৎ সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। জীবজগতের আবির্ভাবের বয়স মনে করা হয় ১৫০ কোটি বছর। দশ লক্ষ বছর পূর্বে আবির্ভাব ঋজু মানুষের, আদি হোমোসেপিয়েন্স [Homo-sapience] ২ লক্ষ ৫০ হাজার বছর পূর্বে। ১ লক্ষ ৫০ হাজার বছর আগে নিয়ান ডারথাল মানুষ, চল্লিশ হাজার বছর আগে ক্রো ম্যাগনন [উচ্চ অববাহিকার গুহা ও বস্কোপের অধিবাসী], অবশেষে আধুনিক মানুষ Homo-sapience। আর শিলালিপিতে বিভিন্নভাবে পাওয়া মানুষের ইতিহাস অর্থাৎ মোটামুটি ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত সময়কাল দশ হাজার বছরের। পণ্ড শিকার ও ফলমূল সংগ্রহই ছিল সেই সময়কার জীবন জীবিকার উপায়। গ্রীক ও রোমে মানব সভ্যতার প্রথম উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে দু’ তিন হাজার বছর আগে। সেই সময়কার তিনজন ব্যক্তিত্বকে আমরা স্মরণ করতে পারি প্লেটো, এরিস্টোটল এবং থিওফ্রাস্টটাস।
ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালকে মধ্যযুগ ধরা হয় এবং সে সময়কালে দেখা যায় গ্রীক ও রোমানদের সেই ঐতিহ্যের কথা ইউরোপবাসীর প্রায় ভুলতেই বসেছিল। ১৪০০ খ্রিঃ থেকে ১৬০০ খ্রিঃ পর্যন্ত ইউরোপে চলে শিল্প বিপ্লব, যাকে বলা হয় ‘রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরনের যুগ’। এই যুগে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়। রেনেসাঁ পরবর্তি যুগেও বিজ্ঞানের সেই যুত্রা যা অব্যাহত রয়েছে। এই কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হলো দুই‘তিন হাজার বছর ধরে মানুষ প্রকৃতি এবং পারিপার্শ্ব থেকে যা কিছু জ্ঞান অর্জন করেছে তাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে ভুল বা নির্ভুল নির্ধারণের যে সময়কাল তা কিন্তু দু-তিন হাজার বছরের নয়। পৃথিবীর উৎপত্তি, জীবের উৎপত্তি, মানুষরূপী শ্রেষ্ঠ প্রাণীর আত্মপ্রকাশ ‘আমরা কিভাবে বেঁচে আছি’ কিভাবে ভূ-পৃষ্ঠে চলাফেরা করছি- এই ধারণাগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ খুব বেশী দিনের নয়। স্যার আইজ্যাক নিউটন যাঁর জীবনকাল ১৬৪২-১৭২৭ পর্যন্ত, তিনি জানালেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা; এই মহাবিশ্বে যে কোনো দুটি বস্তুকণা পরস্পরকে আকর্ষণ করে এই আকর্ষণকে মহাকর্ষ বলে। এ ছাড়াও তিনি বস্তুর ভর, গতি ও বলের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে সূত্র প্রাকাশ করেন। এভাবে দেখা যায়-রবার্ট হুক কর্তৃক মোমবাতির আলোতে আলোকিত করে মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারও খুব বেশী দিনের নয়- ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দে। এরপর থেকেই শুরু হয় এর জয়যাত্রা। খালি চোখে না দেখা জিনিসের এক বিস্ময়কর অস্তিত্ব।
মানুষ জানতে পারে জীবদেহ গঠনের কথা অর্থাৎ কোষের কোষের কথা, নিউক্লিয়াসের কথা। ক্রোমোজমের কথা, মাত্র এই শতাব্দীতে ১৯৫৩ সালে ডিএনএ [DNA]-এর কথা; আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ধারণা-জীবনের শুরু এই ধরনের Molecule থেকেই।
বিজ্ঞান গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও খুব বেশী দিনের নয়। ইতালীয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্যালিলিও যাঁর জীবনকাল ১৫৬৪-১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যিনি কোপর্নিকাসের (১৪৭৩-১৫৪৩) বক্তব্য সূর্যের চারদিকে পৃথিবীসহ সব গ্রহ ঘোরে বলে নিগৃহিত হয়েছিলেন তাঁর উদ্যোগেই ইতালীর রোম শহরে ১৬০৩ অব্দে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রথম বিজ্ঞান একাডেমি ‘একাডেমি ডাই লিপস’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এর মুখপত্রটিই ছিল পৃথিবীর সর্বপ্রথম বিজ্ঞান সাময়িকী। জার্মানীর লিওপোল্ডীয় একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৫২ সালে; ১৬৫৭ সালে ইতালীর ফ্লোরেল শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফ্লোরেন্সীয়ান একাডেমি অব এক্সপেরিমেন্ট’। লন্ডন রয়্যাল সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৬২ সালে। এই সোসাইটির মুখপত্র Nature খুব খ্যাতি লাভ করেছে। French Academy of Sciences প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৬৬ সালে। মানব সভ্যতা শুরুর সময়কালের তুলনায় পৃথিবীব্যাপী এইসব বিজ্ঞান একাডেমি প্রতিষ্ঠার সময়কাল খুব বেশীদিনের নয়।
আমারা যারা বিজ্ঞান চেতনা বা বিজ্ঞানমনস্কতা সৃষ্টির জন্য ‘বিজ্ঞানচেতনা পরিষদ’ বা ‘বিজ্ঞান মঞ্চে’, সমবেত হচ্ছি – আমাদের প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার এবং তা ছড়িয়ে দেয়ার। আমরা আমাদের চারপাশের যে বদ্ধ ধারণা বা কুসংস্কারের কথা বলছি- তার উত্তর একমাত্র নিহিত বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাদানের ওপর। আমাদের যেমন ধারণর সুজলা সুফলা পৃথিবীতে সভ্য মানুষ এসে বসবাস শুরু করেছে। কেউ আমাদের বানিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে, তিনি যেমন চেহারা দিচ্ছে আমরা তারই মালিক হচ্ছি, কী কুদরতে আমরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন চেহারার অধিকারী হচ্ছি, আমাদের যে পুত্র বা কন্যা সন্তান হচ্ছে- তাও তারই ইচ্ছা। আবার কন্যা সন্তানের জন্য মেয়েদেরকে দায়ী করে নিগৃহীত করা হচ্ছে- ইত্যাদি।
অথচ এই প্রশ্নসমূহের জবাব বিজ্ঞানীদের জানা হয়েছে খুব বেশী আগে নয়। সাদামাটা ভাবে কিছু বিষয়ের ব্যাখ্যা ১৯ শতকে দিলেও মাত্র বিংশ শতাব্দীতে আরও সুশৃঙ্খলভাবে ব্যাখ্যা দিতে সমর্থ হয়েছেন বিজ্ঞানীগণ, বংশগতিবিদ্যা সম্পর্কে জানতে পেরে এবং DNA আবিষ্কারের পরে।
পৃথিবীতে মানুষের আগমন সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা তার বিপরীতে সামান্য কিছু প্রশ্ন করলে এর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সম্ভব। যেমন যে মানুষ পৃথিবীতে এল তারা কত বছর বয়সের ছিল? শিশু, কিশোর, প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ কেমন চেহারার ছিল? এবং শুধু মানুষ তো নয়, এত প্রাণী অর্থাৎ জীবজন্তু গাছপালা যেমন- বটগাছ কি পৃথিবীতে বিশাল বিশাল ঝুড়ি নিয়ে এল না বীজ বা চারারূপে এল ইত্যাদি। আবার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুসের বিভিন্ন চেহারা আফ্রিকান, আমেরিকান, রেড ইন্ডিয়ান, জাপানী, মঙ্গোলিয়ান। আমাদের দেশেও আমরা দেখতে পাই সাঁওতাল, রাখাইন, চাকমা, হাজং গারো প্রভৃতি। এক দম্পতি যদি পৃথিবীর সকল মানুষের পূর্বপুরুষ হন তাহলে এত আকৃতি প্রকৃতি বা লম্বা খাটো সাদা কালো অর্থাৎ এত বর্ণ কি করে সম্ভব?
পৃথিবীতে একদিনে সকল জীবের আগমন যে ঘটে নাই- এর প্রমাণ মেলে জীবাশ্মে। কেননা, ভূ-স্তর খনন করে একই স্তরে একই ধরনের জীবাশ্ম পাওয়া যায় নি।
অসমাপ্ত



0 টি মন্তব্য:
Post a Comment