Jul 17, 2008

মানুষের ক্রমবিকাশের ধারা

মানুষের ক্রমবিকাশের ধারা
সৈয়দ আমীরুল ইসলাম


‘এপ’ জাতীয় জীব থেকে মানুষের উদ্ভব বলে আধুনিক নৃবিদরা মনে করেন। এসব এপ বা এর উত্তররসুরিদের দাঁত, চোয়ালের হাড়, মাথার খুলি, পায়ের হাড়, হাতের অংশবিশেষ ইত্যাদি সারা পুথিবীর নানা স্থানে পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত নিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে এসব প্রাণীর ক্রমবিবর্তনের আলোচনা নৃবিদরা করেছেন। এদের মধ্য দিয়ে মানুষের ক্রমবিকাশের ধারাটি যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। এখানে সংক্ষেপে এ মানুষের ক্রমবিবর্তনের এই রূপটি তুলে ধরা হলো।

এপ্
মানব জাতির খুব কাছাকাছি এক ধরনের প্রাণী হলো এপ। এ রকম প্রধান প্রাণী আছে চারটি, শিম্পানজি, গিবন, গরিলা এবং ওরাং ওটাং। এদের দেহ লোমে ভরা। লেজ নেই। পায়ের চেয়ে দীর্ঘ হলো হাত। হাত ও পায়ের আঙুল লম্বা লম্বা। মস্তিষ্ক বেশ বড়। বুদ্ধি মানুষের কাছাকাছি। শারীরিক দিকে এরা অনেকটা মানুষের মতো। অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা এদের এবং মানবজাতির পূর্বপুরুষ ছিল এবই কোন জীব; কিন্তু এরা মানুষের পা হাতের চেয়ে দীর্ঘ। দেহে লোম অনেক কম।

বানরের সাথেও এদের বেশ মিল রয়েছে, তবে এপ্-এর মত বুদ্ধি বানরের নেই। অনেক বাসরের লেজ রয়েছে। বানর চার হাত-পা এপ্-এর চেয়ে আরো স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করে গাছে গাছে ঝাঁপাঝাঁপি, ঝোলাঝুলি এবং মাটিতে দৌড়াদৌড়ি করতে পারে।

আকারে গরিলা সবচেয়ে বড়, তারপর ওরাং-ওটাং এবং তারপর শিম্পানজি। সবচেয়ে ছোট হলো গিবন। খাদ্য হিসেবে গরিলা লতাগুল্ম ও চারাগাছ এবং অন্যেরা গাছের ফুল খেয়ে থাকে। গিবন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনে-জঙ্গলে পাওয়া যায়। শিম্পানজি দেখা যায় পশ্চিম এবং পূর্ব আফ্রিকায়। গরিলা পাওয়া যায় পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকার জঙ্গলে এবং পূর্ব আফ্রিকার পার্বত্য বনাঞ্চলে। ওরাং ওটাং এশিয়া মহাদেশের বোর্নিও এবং সুমাত্রার জঙ্গলে বাস করে। পুরুষ ও মেয়েরা গিবন বাচ্চাসহ পরিবারের মত বসবাস করে। শিম্পানজি বিশ থেকে চল্লিশটি পর্যন্ত একত্রে থাকে। ওরাং ওটাং মাধারণত একা থাকে, তবে মেয়েরা সন্তানাদি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বয়স্ক পুরুষ গরিলাদের পিঠে সাদা লোম গজায় এবং এদেরই একজন দলনেতা হিসাবে বিশটি পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে একত্রে ঘুরে বেড়ায়।

হোমিনিড
‘হোমিনিড’ শব্দটি বোঝায় মানবসদৃশ অর্থাৎ দেখতে মানুষের মত কোন জীব। এপ এবং মানুষের বানর থেকে আলাদা করে বোঝানোর জন্য হোমিনিড শব্দ ব্যবহৃত হয়। হোমিনিড মানবসদৃশ হলেও এটি ঠিক ‘এপ’ কে বোঝায় না। হোমিনিড হলো সত্যিকার মানন কিংবা মানুষের মত প্রাণী যার সাথে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক আছে। অর্থাৎ এ ধরনের জীব থেকেই মানুষের উদ্ভব।

প্লিওপিথেকাস হলো সর্বপ্রাচীন এক ধরনের প্রোটো-এপ। অনেকটা আধুনিক গিবন-এর মত দেখতে।

প্রোকনসাল আফ্রিকানাস
১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দে আফ্রিকা মহাদেশের কেনিয়া অঞ্চলে ‘এপ’ জাতীয় জীবের ফসিল পাওয়া যায়। এদের সাধারণ নাম প্রোকনসাল। ১৯৪৭-এ আরো এদের বহু দেহবিশেষ পাওয়া যায়-চোয়াল, দাঁত, হাড়গোড় এবং মস্তিষ্কের খুলি। ভূতাত্ত্বিক হিসেবে মাইয়োসিন যুগের এরা অধিবাসী। শিম্পানজির আকার থেকে গরিলার আকার পর্যন্ত এরা হতো। লেজযুক্ত বানর থেকে লেজবিহীন এপ ধরনের জীবের এরা অন্তর্বতী স্তর বলে মনে করা হয়। কেউ কেউ মানুষ এবং এনথ্রপয়েড এপ জাতীয় মাঝখানের কোন বিলুপ্ত প্রাণীর সঙ্গে এরা সম্বন্ধযুক্ত বলে মনে করেন। শিম্পাঞ্জির পূর্বপুরুষবলে অনুমিত বর্তমানকালে যে এনথ্রপয়েড এপ ড্রাইপিথেকাস নামে পরিচিত এদেরই আগে প্রোকনসাল বলা হতো। ইউরোপ, ভারত এবং চীনে এদের ফসিল পাওয়া গেছে।

রামাপিথেকাস
রামাপিথেকাস এক ধরনের ‘এপ’। ৮০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে এরা জীবিত ছিল। ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দে আমেরিকার নৃবিজ্ঞানী জর্জ ই-লুইস এদের প্রথম আবিষ্কার করেন। চোয়ালের অংশবিশেষ এবং কয়েকটি দাঁত তিনি উদ্ধার করেন। উত্তর ভারতের দিকে এগুলো পাওয়া যায়। তিনি এদের নাম দেন রামপিথেকাস। সংস্কৃত ভাষার মহাকাব্য রামায়ণ-এর নায়ক ‘রাম’-এর নাম অনুসারে এ নাম প্রদান করা হয়েছে।

অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন রামপিথেকাস হলো হোমিনিড অর্থাৎ মানব জাতীয় জীবের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭০-এর পর এদের প্রচুর ফসিল পাওয়া গেছে। সে-সব গবেষণা করে বর্তমানে ধারণা করা হয় যে, এরা ওরাং ওটাং জাতীয় জীবের পূর্বপুরুষ। এরা এশিয়ায় বসবাস করতো। তবে অন্য স্থানেও এদের ফসিল পাওয়া গেছে। ভারত ছাড়া পাকিস্তান, তুরস্ক, চীন, হাঙ্গেরি, কেনিয়া ইত্যাদি অঞ্চলেও এদের অস্তিত্ব মেলে। এদের খাদ্য ছিল বিভিন্ন ধরনের বিচি, গাছগাছালির শেকড় এবং নানা জাতীয় বীজ।

কেনিয়াপিথেকাস
১৯৬২ খ্রীস্টাব্দে প্রখ্যাত নৃবিদ লুই সাইমর বেজেট লেকি আফ্রিকার কেনিয়া অঞ্চলে এপসদৃশ প্রাণীর চোয়াল এবং কয়েকটি দাঁত উদ্ধার করেন। এগুলো আনুমনিক এককোটি চল্লিশ লক্ষ বছর আগের বলে তিনি ধারণা করেন। এই নিদর্শনগলোর তিনি নাম দেন ‘কেনিয়াপিথেকাস’। পরবর্তীতে এগুলোর আরো চিহ্ন এ অঞ্চলে পাওয়া গেছে। বিশ লক্ষ বছর আগে এ অঞ্চলে মানুষের প্রথম আবির্ভাব হয়েছিল বলে নৃতত্ত্ববিদগণ মনে করেন। উল্লিখিত প্রাপ্ত নিদর্শনগুলো তাদেরই কোন পূর্বসূরির হতে পারে বলে মনে হয়।

অস্ট্রালোপিথেকাস
বহু নৃবিদ মনে করেন যে অস্ট্রালোপিথেকাস হলো মানব জাতীয় জীবের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। এরা আফ্রিকায় বসবাস করতো। চল্লিশ থেকে দশ লক্ষ বছর আগে এরা জীবিত ছিল। অস্ট্রালোপিথেকাস শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ অস্ট্রালিস [অর্থ দক্ষিণ] এবং গ্রীক শব্দ পিথেকাস [অর্থ এপ] থেকে। এদের প্রথম হোমিনিড বলা হয়। আগেই বলা হয়েছে হোমিনিড হলো মানবজাতি এবং প্রাগৈতিহাসিক মানবসদৃশ জীবগোত্রভূক্ত জীব।

অনেকে চার ধরনের অস্ট্রালোপিথেকাস চিহিত করেন: ১. অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিনেসিস- চল্লিশ লক্ষ বছর আগে পুর্ব আফ্রিকার অধিবাসী ছিল এরা; ২. অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস – ২৫ লক্ষ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় জীবিত ছিল; ৩. অস্ট্রালোপিথেকাস বোইসেই – ২৫ লক্ষ বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় এদের দেখা যেতো; এবং ৪. অস্ট্রালোপিথেকাস রোবাস্টাস – ২০ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় এরা ছিল।
অস্ট্রালোপিথেকাস সোজা হয়ে দাঁড়াতে এবং দু পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারতো। এরা চার থেকে পাঁচ ফুট [১২০ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার] দীর্ঘ হতো। এদের মস্তকের পরিমাপ ছিল আধুনিক মানুষের মস্তিষ্কের তিন ভাগের এক ভাগ। বহু নৃবিদ মনে করেন ক্ষুদ্র অস্ট্রালোপিথেকাস থেকেই মানুষের উদ্ভব হয়েছে।

১৯২৪ খ্রীস্টাব্দে এদের ফসিল প্রথম পাওয়া যায়। অস্ট্রেলিয় নৃবিদ রেমন্ড এ, ডার্ট একটি শিশুর মাথার খুলি দক্ষিণ আফ্রিকায় পান। তিনি একে হোমিনিডভুক্ত জীব বলে মনে করেন কিন্তু অনেকে আবার একে বিলীন হয়ে যাওয়া এপ এর শেষ চিহ্ন বলে মনে করেন। প্রাপ্ত বিভিন্ন ফসিল থেকে এদের বর্তমানে হোমিনিড বলেই বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। ইথিওপিয়া, তানজানিয়া ইত্যাদি অঞ্চলেও এদের ফসিল পাওয়া গেছে। এসব ফসিল দেখে মনে হয় মানবসদৃশ এইসব জন্তু মানুষ কর্তৃক অস্ত্র তৈরির আরো বহু আগে থেকেই – প্রায় বিশ লক্ষ বছর আগেই সোজা খাড়াভাবে হাঁটতে পারতো।

হোমো হেবিলিস; দক্ষ মানুষ
ল্যাটিন ‘হোমো’ শব্দের অর্থ মানুষ, আর ‘হেবিলিস’ অর্থ দক্ষ। এ থেকে এদের বলা যায় দক্ষ মানুষ। এদের ফসিলের সঙ্গে পাওয়া গেছে সবচেয়ে প্রাচীন হাতিয়ারপাতি। মনে হয়, এরাই এসব হাতিয়ারের প্রস্তুতকারী। নৃবিজ্ঞানীদের অধিকাংশই হোমো হেবিলিসকে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন পূর্বপুরুষ বলে মনে করেন।

0 টি মন্তব্য:

Post a Comment

 
-:-