বিজ্ঞান দর্শন
শিবাজী দে
সহকারী অধ্যাপক
আব্দুলপুর সরকারি কলেজ, নাটোর।
শিবাজী দে
সহকারী অধ্যাপক
আব্দুলপুর সরকারি কলেজ, নাটোর।
বিজ্ঞান দর্শন দর্শনের অন্যান্য শাখা যেমন- মনোদর্শন, ধর্মদর্শন, নীতিদর্শন, রাষ্ট্র-দর্শন ইত্যাদি শাখার মতই একটি শাখা। প্রকৃতপক্ষে দর্শন বিষয়টিই জ্ঞানের একটি অনন্য শাখা হিসেবে শিক্ষার অন্যান্য বিষয় যেমন জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, ইতিহাস, ভূগোল এগুলো থেকে বৈশিষ্ট্যগতভাবে আলাদা। অন্যান্য বিষয়ের মতো দর্শনের যেমন কোন সুনির্দিষ্ট বিষয় নেই, তেমনি সম্ভাব্য সকল বিষয়বস্তুই দর্শনের অন্তর্ভুক্ত এবং কোন না কোনভাবে যে কোন বিষয়েই দর্শনের প্রবেশাধিকার থাকে। মূলত: দর্শনকে তার বিষয়বস্তু দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা বিফলে পর্যবসিত হয় বরং একে এক অনন্য সুশৃঙ্খল পদ্ধতি ও তার আবেদনের দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করলেই বুঝতে সুবিধা হয়। দর্শন তার বিচার বিশ্লেষণের পদ্ধতির সাহায্যে জীবন ও জগতের বিভিন্ন মৌলিক সমস্যাগুলি (যেগুলো যে কোন বিষয় থেকে উদ্ভূত হতে পারে) সমাধানের চেষ্টা করে। এদিক থেকে বিজ্ঞান থেকে উদ্ভূত নানা মৌলিক প্রশ্নগুলি যার সমাধান শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে পাওয়া যায় না, বিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলো যেগুলো বিভিন্ন বিভাগের জন্য আলাদা এবং সমন্বয়হীন, বিজ্ঞানের ভিত্তিগুলো সুদৃঢ় কি না ইত্যাদি বহু প্রশ্নের সমাধানের চেষ্টায় দর্শনের একটি শাখা হিসাবে জ্ঞান দর্শনের সৃষ্টি।
উনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিজ্ঞান মানব-জীবনের উপর সর্বাত্মক প্রভাব ফেলেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারে জীবনের প্রতিটি দিকই আরো গতিশীল হচ্ছে। এদিক থেকে বিজ্ঞান-দর্শনও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞানকে এক সুশৃঙ্খল, সন্দেহাতীত জ্ঞানের শাখা এবং অন্যান্য বিষয়ের সাথে এর সমন্বয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব, মানবজীবনে এসব তত্ত্বের প্রভাব, এগুলোর সাথে সমাজ ও মানবিক মূল্যবোধের তুলনা ও সমন্বয় সাধন এসব নিয়েই বিজ্ঞান-দর্শন বিচার বিশ্লেষণ ভিত্তিক আলোচনা করে চলেছে। তাই বলা যায়, মানব জীবনের বাস্তব প্রয়োজনেই বিজ্ঞান-দর্শনের আবির্ভাব। বিজ্ঞান-দর্শন মূলত কি জাতীয় কাজগুলো করে তারই একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার প্রয়াস এখন নিচ্ছি।
বিজ্ঞান-দর্শন মনে করে বিজ্ঞান যে সব ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে এবং যে সব ধারণা তারা বিভিন্ন তত্ত্ব বা মতবাদ হিসেবে উপস্থাপন করে সেসব ধারণাকে পরিস্কার করা ও শুদ্ধিকরণ দর্শনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিজ্ঞান-দর্শনের দার্শনিকরা বিশ্বাস করেন বিভিন্ন প্রতীক সম্পর্কে পরিস্কার বর্ণনা এবং আনুপূর্বিক বিবৃতি অধিবিদ্যক বিভিন্ন অনুমান পরিহার করতে সহায়তা করে। তা না হলে অধিবিদ্যক বিভিন্ন অনুমান থেকে সহজেই বিচারহীন তত্ত্বমূলক কোন অঙ্গীকার সৃষ্টি হতে পারে যা ঘটনার প্রকৃত অবস্থাকে আড়াল করে রাখে। বিজ্ঞান-দর্শন সাধারণ ভাষার বিভিন্ন বৈচিত্রময় ব্যবহারের মধ্যে সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্টগুলো বের করে এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন অনুসন্ধানের পদ্ধতিগুলোতে যেসব ভাষা ব্যবহার করা হয়, তাদের মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করে। সাধারণ ভাষায় অনেক অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থকতা থাকে তাই বিজ্ঞানের অনুসন্ধান কাজে ব্যবহারের জন্য ভাষাকে সুনির্দিষ্ট, পরিস্কার ও প্রাঞ্জল হওয়া প্রয়োজন। তাই বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ভাষা বা প্রতীক (ভাষাও এক ধরণের প্রতীক) গুলোকে সুনির্দিষ্ট ও প্রাঞ্জল করার কাজকেও বিজ্ঞান-দর্শন গুরুত্ব দেয়।
বিজ্ঞান-দর্শনের দার্শনিকরা প্রকৃত বিচার্য বিষয়ের সাথে ধারণাগত বিষয়ের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে তার বিশ্লেষণ করে। অন্যকথায় তারা মনে করে আমরা বিশ্ব-প্রকৃতি সম্পর্কে যা বলি তা থেকে যখন কোন ভাব বা ধারণা নিয়ে আলোচনা করার সময় যা বলি তা সম্পূর্ণরূপে অন্যরকম। উদাহরণস্বরূপ যখন আমরা বলি, "খুব বেশী পরিমাণে আহার করার পর আমার বদহজম হয়েছিল" তা থেকে যখন বলি "অতিভোজনে বদহজম হয়" কথাটি ভিন্ন ধরণের। প্রথম দৃষ্টান্তে আমরা বাস্তব জগতের কোন ঘটনা সম্পর্কে বলি। কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে আমরা কারণ ও কার্যের মধ্যে সম্পর্কের যে ধারণা, সে সম্পর্কে বলি। বিজ্ঞান-দর্শনের দার্শনিকরা সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিভিন্ন ধারণা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট অর্থ উদ্ভাবন করে। এর ফলে মানবীয় যোগাযোগের কাঠামোবদ্ধ আকারের সাথে ধারণাগুলি সঙ্গতি স্থাপন করতে পারে। বিজ্ঞান-দর্শন বাস্তব ঘটনাবলী বা মূল্য প্রসঙ্গে ঢিলেঢালাভাবে কোন মন্তব্য করাকে বিজ্ঞানের তত্ত্বগুলোর জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করে।
বিজ্ঞান-দর্শনের দার্শনিকরা বিজ্ঞানীদের দেয়া বিভিন্ন ধারণা ও বিবৃতিগুলোকে সতর্কভাবে পরীক্ষা করে দেখে যে তারা যথাযথ ও নির্ভুলভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে কি না এবং সেগুলো সংগতিপূর্ণভাবে সম্পর্কিত কি না। এ জাতীয় অতিসতর্ক প্রহরার কাজে কখনো কখনো প্রতীকী যুক্তিবিদ্যা ব্যবহার করা হয়। তবে এরা বিজ্ঞানের গবেষণার বিষয়বস্তু বা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের বিশেষ কৌশল সম্বন্ধে বিশেষ উৎসাহী হয় না বরং বিশেষ ধরণের প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উত্থাপন করে যার উত্তর অবশ্যই একমাত্র ধারণাগত স্তরেই পাওয়া সম্ভব। যেমন:
- কখন এবং কি পরিস্থিতিতে আংশিক ও বিশেষ প্রাপ্ত তথ্য থেকে সার্বিকীকরণ বা সাধারণীকরণ করা বৈধ হবে?
- বৈজ্ঞানিক নিয়ম বলতে প্রকৃতপক্ষে কি অর্থ বোঝায়?
- যখন বলা হয় কোনকিছু 'কারণ' দ্বারা ঘটেছে, তার প্রকৃত অর্থ কি?
- পর্যবেক্ষণকৃত ভাষা কি বিজ্ঞানের সকল শাখার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?
- বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে কোন গোপনীয় বা সন্দেহজনক কোন পদ্ধতির ক্ষেত্রে কৃত্রিম ভাষা প্রযোজ্য হবে কি না। - ইত্যাদি
বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে এবং বিভিন্ন শাখায় এদের ব্যবহারও বহুবিধ। বিজ্ঞান দর্শন এসব নানারকম পদ্ধতি এবং এদের ব্যবহার সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানার চেষ্টা করে। আবার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বলতে কি বোঝায়, তারা কিভাবে কাজ করে এবং এদের সত্যতা কিভাবে প্রতিপাদন করা হয়। সহজভাবে বলা যায় - কোন তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক স্তরে উন্নীত হয় যদি তা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের ভিত্তিতে গৃহীত হয় এবং পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে এই তত্ত্ব সত্য বলে প্রমাণিত হলে তা আমরা বিশ্বাস করি। তবে এ জাতীয় বক্তব্যের সমস্যা হলো এগুলো একদিক থেকে বেশী ব্যাপক আবার অন্যদিক থেকে খুবই সংকীর্ণ। এ কথাটা খুব বেশী ব্যাপক এই অর্থে যে, প্রায় সব মতবাদই বৈজ্ঞানিক হিসেবে গৃহীত হতে পারে। যেমন প্রাচীন একটি তত্ত্ব ছিল যা বলতো যে পৃথিবী কচ্ছপের পিঠে স্থির হয়ে আছে। এই তত্ত্বটিও পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছিল। ধারণা করা হতো - পৃথিবী মহাকাশ থেকে গড়িয়ে কেন পরে না, নিশ্চয়ই কচ্ছপের পিঠে স্থির থাকার জন্যই পৃথিবীও স্থির হয়ে আছে। এ জাতীয় প্রাচীন বিভিন্ন তত্ত্ব যা এখন হাস্যকর মনে হতে পারে, সেগুলো সে সময় পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভর করেই মানুষের ধারনা গড়ে উঠেছিল। আবার বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্পর্কিত বক্তব্যটি খুবই সংকীর্ণ এই কারণে যে সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলোকেই যেগুলো সত্য হিসেবে স্বীকৃত তাদেরকে বিবেচনার অযোগ্য বলেও প্রমাণ করা যায়। যেমন 'কার্য-কারণ' তত্ত্বে বিশ্বাসের উপরই সকল বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু 'কার্য-কারণ' তত্ত্বের বৈধতা সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলা যায়।
প্রকৃতপক্ষে কোন একক তত্ত্বকে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণ দ্বারা সত্য বলে প্রমাণ করা যায় না। সেখানে সবসময়ই পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণগুলোর উন্মুক্ত ও অনির্দিষ্ট সম্ভাব্য তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার সুযোগ থাকবে। যেমন জ্যোতির্বিদ্যায় কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদ দ্বারা টলেমী'র ভূ-কেন্দ্রিক জ্যোতির্বিদ্যা ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছিল। মূলত: কোপার্নিকাসের তত্ত্ব বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল, কিন্তু টলেমীর তত্ত্ব তা ছিল না। যদিও টলেমীর তত্ত্বের মাধ্যমেও অনেক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে সংগতিপূর্ণ করা যেতো। টলেমীর তত্ত্ব বাতিল হওয়ার আরেকটি কারণ এর জটিলতা ও অস্পষ্টতা। তাই বলা যায় বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব (যা আমরা সত্য হিসেবে প্রমাণ করে বিশ্বাস করি) এবং অভিজ্ঞতা (যা তত্ত্বের স্বপক্ষে আংশিক বা কখনো সম্পূর্ণরূপে অনুমোদন করে) এই দুই এর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নিরূপন করা খুব সহজ বিষয় নয়। শুধুমাত্র অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দিয়ে কোন তত্ত্বে পৌঁছানো যায় না বা এর সত্যতা প্রমাণ করা যায় না। সেক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কি তা বের করার চেষ্টা করা বিজ্ঞান-দর্শনের একটি প্রধান কাজ।
মূলত: বিজ্ঞান-দর্শন বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেগুলো সত্যতা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাদের শুদ্ধতা রক্ষা তথা সংশোধন, ও প্রয়োজনে পরিমার্জনের দিক-নির্দেশনা দেয়। কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে কোন ভাবে কোন অধিবিদ্যক বিষয়াদি প্রবেশ না করতে পারে, কিংবা কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কোন বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত না হয় সে বিষয়ে বিজ্ঞান-দর্শন অতন্দ্র প্রহরী হয়ে কাজ করে।



0 টি মন্তব্য:
Post a Comment