Aug 31, 2009

সেটি কি সফল হবে? - জীবনবাহী গ্রহের প্রাচুর্য

পূর্বের আলোচনার পর....

The Abundance of Life-Bearing Planets
By Carl Sagan

জীবনবাহী গ্রহের প্রাচুর্য
কার্ল সাগান


আমরা উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের এক যুগে বাস করি। নেবুলা নক্ষত্রমণ্ডলের মতো গ্যাসের চাকতি ও ধূলিকণা সূর্যসদৃশ নক্ষত্রগুলোর অর্ধেকের মধ্যেই রয়েছে। আমাদের গ্রহগুলি ৪.৬ বিলিয়ন বৎসর আগে গঠিত হয়েছে এই নেবুলা নক্ষত্রমণ্ডলে। বেতার তরঙ্গের এক নতুন, অপ্রত্যাশিত পদ্ধতিতে আমরা অন্ততঃ ২টি পৃথিবীর মতো গ্রহ খুঁজে পেয়েছি। ৫১ পেগাসি (Pegasi) তারকার পাশে এক বিরাটাকার গ্রহ স্পষ্টভাবে দেখাও গেছে।

নিকটবর্তী তারকারাজির পাশে যদি এই বিশালাকার গ্রহগুলি থেকে থাকে তাহলে ভূমিতে স্থাপিত এবং মহাকাশ সম্বন্ধীয় কিছু নতুন প্রযুক্তি যেমন অ্যাসট্রোমেট্রি (Astrometry), স্পেকট্রোফটোমেন্ট্রি (Spectrophotometry), রেডিয়াল ভেলোসিটি মেজারমেন্টস (Radial Velocity Measurements), এডাপটিভ অপটিকস (Adaptive optics) এবং ইন্টারফেরোমেট্রি (Interferometry)- এর সবগুলো গ্রহগুলিকে চিহ্নিত করতে পেরেছে বলেই মনে হয়।

প্রজেক্টগুলোর মধ্যে অন্ততঃ একটি প্রস্তাব (Frequency of Earth Sized Inner Planets) ভিন্নজগতের বিরাট গ্রহগুলিকে স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে। যদি আমাদের প্রতি দেয়া সমর্থনকে হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়া না হয় তাহলে মিল্কিওয়ে ছায়াপথের অন্য নক্ষত্রের গ্রহগুলোকে পর্যবেক্ষণ করার একটি স্বর্ণযুগে আমরা প্রবেশ করতে যাচ্ছি।

আপনি যদি আরেকটি পৃথিবীর মতো ভরযুক্ত গ্রহ খুঁজে পান, তাহলে এটা পৃথিবীর মতো জগত হবে এমনটা নাও হতে পারে। ধরুন শুক্রগ্রহ। কিন্তু আমরা এই বিষয়টা তদন্ত করতে পারি। আমরা সমুদ্রের জলের অবশিষ্টাংশের বর্ণিল স্বাক্ষর খুঁজতে পারি। গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ও ওজন খুঁজতে পারি। গ্রহের আদিম তাপীয় অস্থির পরিবেশে মিথেনের পরমাণু খুঁজতে পারি। আমরা অক্সিজেনের পরমাণুও খুঁজবো কারণ তা জীবনেরই চিহ্ন। (আসলে এইসব পরীক্ষাগুলোর সবই গ্যালিলিও মহাকাশযানের দ্বারা পৃথিবীর উপরিভাগে ১৯৯০ এবং ১৯৯২ সালে করা হয়েছে এবং তা এখন বৃহস্পতি গ্রহ অভিমুখে ছুটে চলছে। [কার্ল সাগান, ১৯৯৩])

নতুন তৈরি হওয়া সৌরজগতগুলোর পৃথিবীর মতো ভরের গ্রহদের সম্পর্কে সংখ্যা ও আয়তন বিষয়ে সংগৃহীত নতুন তথ্যের সাথে বিভিন্ন গ্রহের সাগরগুলোর দীর্ঘস্থায়িত্ব সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে পাওয়া তথ্যকে একত্রিত করে দেখা গেছে প্রত্যেক সূর্যের মতো নক্ষত্রের চারপাশে একের অধিক নীল জগত থাকতে পারে। সূর্যের চাইতে বেশি ঘনত্বের নক্ষত্রের সংখ্যা কিছুটা দুর্লভ। সূর্যের চাইতে কম ভরের নক্ষত্রের পৃথিবীর মতো গ্রহ থাকতে পারে বলে আশা করা যায়। কিন্তু জীবন থাকার মতো উষ্ণগ্রহগুলো হয়তো এমনভাবে আটকে আছে যে তাদের একটি দিক শুধু স্থানীয় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে।

যাহোক, হয়তো বাতাস ওই ধরণের গ্রহের উষ্ণতাকে এক আবহমণ্ডল থেকে আরেক আবহমণ্ডলে বয়ে নিয়ে যায় এবং প্রাণীর সম্ভাব্য বাসস্থান তৈরিতে ওইসব গ্রহের অগ্রগতি খুবই সামান্য।

তা সত্ত্বেও নতুন পাওয়া প্রমাণগুলো এমন তথ্য দিয়েছে যে, ছায়াপথের বেশ কিছু গ্রহে ধারণার চাইতে বেশি পরিমাণ তরল জল বিলিয়ন বৎসর আগে থেকেই আছে। এর মধ্যে কোন কোনটি জীবনের জন্য বেশ উপযোগী। আমাদের মতো কার্বন ও জল রয়েছে এমন গ্রহগুলোর কোনটির বয়স পৃথিবীর চাইতে কম, কোনটির আবার বিলিয়ন বৎসর বেশি। আর হ্যাঁ, আমাদের ছায়াপথ এক বিরাট সংখ্যক হয়তো শত শত বিলিয়ন সংখ্যক গ্যালাক্সির মধ্যে মাত্র একটি।

বাসযোগ্য জগতে বিবর্তনের জন্য কি বুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে?

অ্যাপোলো মিশনের সংগৃহীত চাঁদে উল্কাপাতের পরিসংখ্যান থেকে আমরা জানি যে প্রায় ৪ বিলিয়ন বৎসর আগে পৃথিবীতে সারাক্ষণ মহাকাশ থেকে আসা ছোট-বড় বিভিন্ন রকমের পদার্থের আঘাতে নরকের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। মুহুর্মুহু উল্কাপাত এতো ভয়ানক ছিল যে এর ফলে আবহাওয়া মণ্ডল ও সমুদ্র মহাকাশে বিলীন হয়ে যেতে পারতো। তারও আগে সমস্ত পৃথিবী ডিমের খোসার মতো পাতলা আবরণযুক্ত এক ম্যাগমার মহাসাগর ছিল। আর এটা পরিষ্কার যে সেই অবস্থায় জীবনের উদ্ভবের কোন পরিবেশই ছিল না।

হ্যাঁ, ঠিক তার পরপর, মেয়র যেমন বলেছেন- ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে কিছু প্রাথমিক জৈব পদার্থ তৈরি হয় (ফসিলগুলোর দেয়া প্রমাণ সাপেক্ষে)। অনুমান করা হয় যে, জীবনের সূচনা তার কিছু আগে থেকে শুরু হয়েছিল। এরপর অবস্থা অনুকূলে আসার সাথে সাথে জীবন বিস্ময়করভাবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। আমি এই ঘটনাটা আগেও বলেছি (সাগান, ১৯৭৪)। জীবনের উৎস আসলে এমন একটি সম্ভাবনাময় অবস্থা, যা পরিবেশের আনুকূল্যের সাথে দ্রুত বিকশিত হয়েছে।

এখন আমি বুঝতে পেরেছি যে, এটা আপাতদৃষ্টিতে ন্যায়সঙ্গত বিতর্ক। আসলে সামান্য এক উদাহরণ থেকে অজ্ঞাত অসীম বিষয়ে ধারণা করার চাইতেও বেশি। কিন্তু আমরা উপাত্তের বাইরে কিছু বলতে পারি না, আমরা এই কাজটাই সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারি।

বুদ্ধির বিবর্তনের ক্ষেত্রে কি একই ধরণের বিশ্লেষণ প্রয়োগ করা যায়?

ধরুন একটি গ্রহে জীবন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, পরিবেশ পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অক্সিজেনসমৃদ্ধ আবহাওয়ামণ্ডল ২ বিলিয়ন বছর আগে থেকে তৈরি হচ্ছে। মেয়র যেমন বলেছেন, তেমন বহুবিচিত্ররূপে এই পরিবর্তন ঘটছে। আর মাত্র ৪ বিলিয়ন বৎসর একটি যান্ত্রিক সভ্যতার উত্থানের জন্য যথেষ্ঠ নয়।

এই বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের প্রথমদিকে (যেমন: G.G. Simpson-The Nonprevalence of Humanoids) লোকেরা এই যুক্তি দেখাতেন যে, ঠিক মানুষ অথবা মানুষের মতো কোন কিছু তৈরি হওয়ার জন্য বিশাল সংখ্যক প্রচেষ্টার প্রয়োজন। অন্য কোন গ্রহে এই ধরণের সম্ভাবনার পুনঃপুনঃ সংঘটনের সংখ্যাও শূন্য। এবং ফলে কোন মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা থাকার সম্ভাবনাও শূন্য।

কিন্তু একথা আমরা পরিষ্কারভাবে বলতে চাইযে, যখন আমরা মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার কথা বলি, তখন স্টারট্রেকের মানুষ বা মানুষের মত কারও কথা বলিনা। আমরা মানুষের মত সমান ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাণী যারা রেডিও টেলিস্কোপ বানাতে এবং পরিচালনা করতে পারে এমন কারো কথা বলি। তারা ভূমি অথবা সমুদ্র অথবা বাতাসে যে কোন জায়গায় বাস করতে পারে। তারা অভাবনীয় রাসায়নিক গড়ন, গঠন, আকার, জৈবিক বৈশিষ্ট্য যে কোন রকম হতে পারে। আমরা এমন মনে করিনা যে মানুষের মত বিবর্তনের একই ধারাবাহিকতা তারা অতিক্রম করেছে। হয়তো বিবর্তনের পথ এত বেশি রয়েছে যার সংখ্যা আমরা ধারণাও করতে পারিনা।

মেয়রের সাম্প্রতিক উপস্থাপনায় মানবসদৃশ প্রাণী না থাকার প্রসঙ্গের প্রতিধ্বনি রয়েছে। তবে আমার ধারণা আমাদের বিতর্কের মূল বিষয়টি সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে। বিবর্তন কোন ভাগ্যনির্ভর বিষয় নয়, এটা উপযুক্ত সময়ে অনিবার্যভাবে ঘটে। ভবিষ্যতের কয়েক বিলিয়ন বৎসরে বুদ্ধিমান প্রাণী তৈরির জন্য কোন পরিকল্পনা এটা নয়। স্বল্পকালীন প্রভাবকের প্রেক্ষিতে এটা হঠাৎ করে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। আর এখনও সবকিছু সমান থাকা সত্ত্বেও বুদ্ধিহীন থাকার চাইতে বুদ্ধিমান হওয়াটা বেশি গ্রহণযোগ্য। আর বুদ্ধিবিকাশের যে গতিপথ তার চিহ্ন জীবাশ্মতেই রয়েছে। অন্য পৃথিবীর কোনটিতে বুদ্ধির প্রতি আগ্রহ উচ্চমাত্রায় রয়েছে, আর কোনটিতে হয়তো রয়েছে কম মাত্রায়।

আমরা যদি কোন একটির উপাত্ত বিশ্লেষণ করি, যেমন আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রে তাহলে দেখবো যে, সৌরজগত সৃষ্টির পর থেকে আজকে যান্ত্রিক সভ্যতার যুগ পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বৎসর লেগেছে। এ থেকে কি বোঝা যায়? আমরা অন্য পৃথিবীতে বদ্ধরূপে সভ্যতা বিকাশ হয়েছে এটা আশা করবো না। কেউ হয়তো বেশ দ্রুত যান্ত্রিক উন্নতি করেছে, কেউ হয়তো ধীরে, আর এটা সন্দেহ নেই যে কোনখানে হয়তো সভ্যতার বিকাশ একেবারে হয়নি। কিন্তু ছায়াপথ (Milky way) দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের তারা দিয়ে ভর্তি (এর অর্থ, যেগুলোতে ভারী পদার্থ রয়েছে)। এর অনেকগুলো ১০ বিলিয়ন বৎসরের পুরনো।

দুটি বিষয় কল্পনা করা যাক, প্রথমটি হল যান্ত্রিক বুদ্ধির বিবর্তনের জন্য সম্ভাব্য সময়ধারা। এটা শুরু হয় খুব ধীরে, কিন্তু কয়েক বিলিয়ন বৎসরে এর অগ্রগতিকে চিহ্নিত করা যায়। ৫ বিলিয়ন বৎসরে এর অগ্রসরের পরিমাণ ৫০ ভাগ, আর ১০ বিলিয়ন বৎসরে হয়তো এই অগ্রসরতা ১০০ ভাগে পৌঁছাবে।
দ্বিতীয় কল্পনাটি সূর্যের মতো তারাগুলিকে নিয়ে। এর মধ্যে কোন কোনটি একেবারে তরুণ। এগুলো এখন জন্মগ্রহণ করল। কিছু আছে যেগুলো সূর্যের মতো বয়সী, আর কিছু আছে, যেগুলো ১০ মিলিয়ন বৎসরের পুরনো।

আমরা যদি এই কল্পনা দুটিকে একসঙ্গে মেলাই, তাহলে দেখবো যে বিভিন্ন তারার গ্রহগুলিতে বিভিন্ন বয়সের যন্ত্রনির্ভর সভ্যতার দেখা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধুমাত্র নতুনগুলোতে নয়। বরং পুরনো তারাগুলোতে এই সম্ভাবনা অনেক অনেক বেশি। খুব সম্ভব আমরা আমাদের চাইতে অগ্রসর সভ্যতার কাছ থেকে সাড়া পেতে যাচ্ছি। এই যন্ত্রকৌশলী সভ্যতাগুলোতে হয়তো কোটি কোটি প্রজাতি রয়েছে।

একসূত্রে গ্রথিত হয়ে যন্ত্রনির্ভর প্রজাতির উদ্ভব ঘটেছে এ ধরণের সাদৃশ্যহীন ঘটনার সংখ্যা আশাতীত। আর হয়তো নিজেদের অনন্য বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গর্ব করে এধরণের প্রজাতি সারা মহাবিশ্বেই রয়েছে।

সেটির (SETI) জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য সভ্যতার প্রয়োজন রয়েছে কি?

এটা নিশ্চিতভাবেই কল্পনা করা যায় যে কবিদের সভ্যতা অথবা ব্রোঞ্জযুগের যোদ্ধারা কখনও হঠাত করেও জেমস ক্লার্ক, ম্যাক্সওয়েলের গণিত এবং বেতার যন্ত্রের দেখা পায়নি। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই পৃথিবী অসংখ্য উল্কা ও ধুমকেতু দিয়ে পরিবেষ্টিত হয়ে আছে। এর কোন কোনটি এত বড় যে একটির আঘাতেই গ্রহের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হল K-T ঘটনা (ক্রিটেসিয়াস যুগের শেষে সংঘটিত আর এর ফলেই জন্ম হয় টারসিয়ারি যুগের।) ৬৫ মিলিয়ন বৎসর আগের এই ঘটনার ফলে ডাইনোসর এবং পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রজাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আগামী শতাব্দীতে এই ধরণের একটি সভ্যতাবিনাশী সংঘর্ষের সম্ভাবনা রয়েছে।

পৃথিবীর নিকটবর্তী বস্তুসমূহকে চিহ্নিত ও অনুসরণ করার সঠিক অর্থ আমাদেরকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। এই বস্তুগুলোকে বাধা দেয়া ও ধ্বংস করার কারণ সম্পর্কে বিশদ জানতে হবে। আমরা যদি তা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদেরকে সবংশে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। সিন্ধু সভ্যতা, সুমেরীয় সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, গ্রিক ও অন্যান্য সভ্যতা খুব বেশিদিন টেকেনি ফলে তাদেরকে এ ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। পার্থিব বা অপার্থিব যেকোন দীর্ঘমেয়াদী সভ্যতাকে এই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতেই হবে। অন্য সৌরজদতকে তুলনামূলকভাবে কম বা বেশি গ্রহাণু বা ধুমকেতুর মুহুর্মুহু আঘাত সহ্য করতে হয়। কিন্তু প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিপদের অস্তিত্ব একেবারে বাস্তব।

রেডিওটেলিমেট্রি অর্থাৎ মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা এবং বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ বিশ্লেষণ ও এই সম্পর্কিত প্রযুক্তিকে মহাকাশীয় হুমকির মুখোমুখি হতেই হবে। ফলে যে কোন দীর্ঘকাল টিকে থাকা সভ্যতাকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের নিয়ম অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে সেটি'র (SETI) মতো প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটাতেই হবে। (এবং এর জন্য বেতার তরঙ্গকে 'দেখতে' পারে এরকম কোন প্রত্যঙ্গ বিকাশের প্রয়োজন নেই। পদার্থবিজ্ঞানই এর জন্য যথেষ্ঠ)।

যখন থেকে গ্রহাণু ও ধূমকেতুগুলোর পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে তখন থেকেই গ্রহাণু ও ধূমকেতুর আঘাত অবিরাম সহ্য করতে হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তির বিশ্রাম নেবার আর কোন অবকাশ নেই। অবশ্য ধুমকেতু ও উল্কাপিণ্ডের সাথে সংঘর্ষের সম্ভাবনার সামনে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এমন শক্তি সেটির (SETI) খুব কম।

(প্রসঙ্গক্রমে জানাই, এটা সত্যি যে সেটি'র (SETI) শক্তি খুব কম। আমাদের গ্যালাক্সির এক অল্প অংশে এটা পৌঁছাতে পেরেছে। যদি প্রয়োজনমতো শক্তিশালী ট্রান্সমিটার আমাদের থাকত, তাহলে দূরের গ্যালাক্সির রহস্য ভেদ করতে সেটি সক্ষম হতো। আমাদের ট্রান্সমিটারগুলো এত পুরনো ডিজাইনের যে সেগুলো যদি আর একটু শক্তিশালী হতো, শুধু এটুকুই আমরা আশা করতে পারি। Megachannel Extraterrestrial Assay [META] এর এটা একটা অন্যতম প্রচেষ্টা)

সেটি কি প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের স্বপ্নবিলাস?

সেটি (SETI) সম্পর্কিত বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের এবং এ বিষয়ে জীববিজ্ঞানীরাও ভালো জানেন বলে মেয়র বারবার উল্লেখ করেছেন। যখন থেকে প্রকৃতিবিজ্ঞান এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত তখন থেকেই মহাকাশবিজ্ঞানী, পদার্থবিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়াররাও সেটি'র (SETI) বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

কিন্তু ১৯৮২ সালে যখন সেটি'র (SETI) বৈজ্ঞানিক মর্যাদা সম্পর্কে 'সাইন্স' পত্রিকায় প্রকাশিত আবেদনটি লিখলাম তখন অনেক নিবেদিতপ্রাণ জীববিজ্ঞানী ও জৈবরসায়নবিদদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে আমার কোন সমস্যা হয়নি। এঁদের মধ্যে ছিলেন ডেভিড বাল্টিমোর, মেলভিন কেলভিন, ফ্রান্সিস ক্রিক, ম্যানফ্রেড এইজেন, থমাস ইসনার, স্টিফেন জে গুল্ড, ম্যাথিউ মেসেলসন, লিনাস পনিং, ডেভিড রাউপ এবং ই.ও.উইলসন। প্রথমদিকে যখন আমি এই বিষয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা তৈরি করছিলাম, তখন আমার বিজ্ঞ পরামর্শদাতা এইচ.জি. মুলারের কাছ থেকে দৃঢ় সমর্থন পেয়েছিলাম। জীববিজ্ঞানী ও জেনেটিকসের উপর নোবেলজয়ী এই বিজ্ঞানীর সমর্থন আমাকে খুবই উৎসাহিত করেছিল। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক না করে আমার আবেদনটি যা প্রস্তাব করেছিল, তা হল- আমরা খুঁজছি-

"আমরা সর্বসম্মতিক্রমে দৃঢ়ভাবে একমত যে বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তার উপস্থিতির পরীক্ষণ একটি পরীক্ষাধীন বিষয়। এই বিষয়ে কোন পূর্বতন আলোচনা এই পর্যবেক্ষণাধীন প্রচেষ্টার পরিবর্তে ব্যবহার বা উপস্থাপন করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।"

কার্ল সাগান: প্লানেটরি সোসাইটির একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৬ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিজ্ঞান জগতে খুবই পরিচিত মুখ ছিলেন। তিনি সেটি'র (SETI) একজন প্রধান সমর্থক। সেটি'র সাফল্য নিয়ে তিনি অনেক লেখালেখি করেছেন।

মূললেখা
Read More ... »

Aug 30, 2009

সেটি কি সফল হবে? মনে হয় না?

Can SETI Succed?
সেটি কি সফল হবে?
অনুবাদ: সুশান্ত বর্মন

মনুষ্যত্বের সীমা ও সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের কোন সংশয় ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সে চিন্তায় পরিবর্তন এনেছে। প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে সাথে প্রযুক্তির নিয়মগুলোকে আমরা অনেকাংশে চিনতে পারছি। কিন্তু তাও যথেষ্ট নয়। কারণ ভিন্নগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা আমাদের মনে নতুন আশার বীজ বপন করেছে। মহাজাগতিক সভ্যতা আছে কি নেই তার নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। মানুষের বোধগম্য হতে পারে এমন তথ্য খোঁজার ভার য়েছে SETI (SEARCH FOR EXTRA TERRESTRIAL INTELIGENT) মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার অন্বেষণ প্রকারান্তরে আমাদের নিজেদেরকে খোঁজার একটি চেষ্টা। এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা? আর কোথাও কি প্রাণের বিকাশ হয় নি। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সভ্যতা কি মানুষের নিজস্ব আবিষ্কার? সভ্যতা ও প্রযুক্তিতে আমাদের চেয়ে উন্নততর প্রাণী কি আর কোথাও নেই? লক্ষকোটি তারার মাঝে একটিতেও কি প্রাণীরা কোন সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলেনি? এরকম বহুবিধ প্রশ্ন দ্বারা নিরন্তর তাড়না থেকে জন্ম হয়েছে সেটি'র।

১৯৫৯ সালের একটি গবেষণাপত্রে গসিপি কোকোনি (Giussepe Cocconi) এবং ফিলিপ মরিসন (Philip Morrison) সেটি'র কল্পনাকে প্রকাশ করেন। সেটি'র মূল দর্শন জন্ম হয় এই গবেষণাপত্র থেকে। সেখানে লেখা ছিল -"যথাযথ পরিবেশ ও বস্তজগতের নিয়মের প্রেক্ষিতে একটি সাধারণ প্রাকৃতিক ফলাফল হল জীবন। বস্তুজাগতিক পরিবর্তনের চলমানতা পৃথিবীতে যেমন নিজস্ব লয়ে চলছে ঠিক তেমন একইভাবে অন্য সব জায়গায় চলার কথা।" আমাদের নিজস্ব ছায়াপথে কোটি কোটি তারা রয়েছে। আমরা কোটি কোটি ছায়াপথের মাঝে মাত্র একটিতে বাস করি। সুতরাং এই মহাবিশ্বের প্রান্তরে প্রান্তরে জীবনের সম্ভাবনা মোটেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। নিশ্চয় এমন অনেক স্বাভাবিক আবাসস্থল আছে যেখানে বিশাল জ্ঞাতিগোষ্ঠী নিয়ে জীবন্ত প্রাণীরা বাস করছে। এর মধ্যে কোন কোন আবাসস্থলে হয়তো বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটেছে। প্রযুক্তিকেও হয়তো তারা করায়ত্ব করেছে। যেহেতু তারা বুদ্ধিমান, সেহেতু তারা অন্য বুদ্ধিমান প্রাণীদের সাথে নিশ্চয় যোগাযোগ করতে আগ্রহী।

বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করে আন্ত:নাক্ষত্রিক যোগাযোগ তৈরি করা যায়। এই তরঙ্গের মাধ্যমে সমগ্র ছায়াপথে অতি সহজে তথ্য আদানপ্রদান করা সম্ভব। কোন কোন মহাজাগতিক সভ্যতা হয়তো বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় স্বাক্ষর দিয়ে নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে চায়। আমাদের তা পড়তে পারা উচিত।

কিন্তু ভিনগ্রহবাসীর উপস্থিতির স্বপক্ষে আজ পর্যন্ত একটা নিখুঁত প্রমাণ আমরা সংগ্রহ করতে পারিনি। যারা মনে করেন এই মহাবিশ্বে প্রযুক্তিগত সভ্যতা একমাত্র মানুষের করায়ত্ব তারাও নিশ্চুপ থাকছেন না। ফলে ভিনগ্রহবাসীর উপস্থিতির স্বপক্ষের আশাবাদী এবং বিপক্ষের নিরাশাবাদী এই দুইরকম তত্ত্বাবলম্বীদের মধ্যে একটা তাত্ত্বিক বিতর্ক বেশ জমে উঠেছে।

আমরা আজ ভিনগ্রহে প্রাণের উপস্থিতি সম্পর্কে একটি বিতর্ক পাঠ করব। এতে বিষয়টিকে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক দুই দিক থেকেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমে আমরা জানব আর্নেস্ট মেয়র (Ernst Mayr) এর বক্তব্য। তিনি বিংশ শতকের সবচাইতে প্রসিদ্ধ বিবর্তনবাদী বিশেষজ্ঞ। তিনি হার্ভার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক জীববিজ্ঞান জাদুঘরের কর্মকর্তা। তাঁর প্রধান বক্তব্য অনন্য মতবাদের উপর। মেয়র নির্দিষ্ট করে বলেন যে ঘটনার শুরু থেকেই বিভিন্ন রকমের অনন্যতা সেটি'র প্রধান সমস্যা। এর বিপরীতে প্লানেটরি সোসাইটি'র (Planetary Society) এবং কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় (Cornell University) এর মহাকাশ চর্চা কেন্দ্রের কার্ল সাগান বক্তব্য দিয়েছেন আশাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। কোন দৃষ্টিকোণ সহজপাচ্য তা জানতে হলে পড়তে থাকুন এবং নিজেই সিদ্ধান্ত নিন।

SETI (সেটি) কি সফল হবে? মনে হয় না?
আর্নেস্ট ময়র (Ernst Mayr)


মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা খুঁজে পাবার সুযোগ কোথায়?
এর উত্তর নিহিত আছে বেশিকিছু ধারাবাহিক সম্ভাবনার উপর। এই সমস্যাটি নিয়ে ১৯৯২ সালে প্রকাশিত একটি জার্নাল দেখেছিলাম। আমি এই লেখাটিকে ভিত্তি করে আমার বক্তব্য তুলে ধরব। এই লেখাটিতে যে সব বিষয় অন্বেষণ করা হয়েছে তা সত্যিই প্রণিধানযোগ্য। আমার চিন্তাপদ্ধতি বেশ কিছু ধারাবাহিক প্রশ্নের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রশ্নগুলো SETI'র সফলতার সম্ভাবনাকে অনেকাংশে সীমিত করে দেয়।

মহাবিশ্বের কোথাও প্রাণ থাকা কি সম্ভব?
SETI প্রজেক্টের সবচেয়ে সন্দেহবাদী ব্যক্তিও এই প্রশ্নের আশাব্যাঞ্জক উত্তর দেবেন। জীবন সৃষ্টির জন্য কোষের প্রয়োজন। সাথে দরকার এ্যামিনো এসিড এবং নিউক্লিয়িক এসিড। দুটো রাসায়নিক পদার্থ একাধিক মহাকাশীয় ধুলিকণাতে পাওয়া গেছে। অতএব এটা সহজেই প্রণিধানযোগ্য যে জীবন মহাবিশ্বের অন্যকোথাও রূপ লাভ করেছে।
আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী জীবনের উদ্ভব হয়েছে ক্ষুদ্রতম একক কোষ থেকে। যে কোনখানে স্বাধীনভাবে জীবন সৃষ্টির এটাই সবচাইতে সম্ভাব্য সমাধান। এ ধরণের স্বকীয় জীবন সৃষ্টির সম্ভাবনা পৃথিবীর চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা রকমের বিরূপ আবহাওয়াতেও সম্ভব।

কোথায় জীবন খুঁজে পাওয়া যেতে পারে?
হ্যাঁ, গ্রহগুলো তো অবশ্যই। আমাদের নিজের নয়টা গ্রহ সম্পর্কে তো বিস্তারিত জানি। সন্দেহ করার কোন অবকাশ নাই যে সব গ্যালাক্সিতে লক্ষ, লক্ষ, বিলিয়ন, বিলিয়ন গ্রহ আছে। আসলে আমরা নিজেদের গ্যালাক্সিকে শুধু কল্পনা করতে পারি।

কতগুলো গ্রহ জীবন উপযোগী বলে বিবেচিত হতে পারে?
কোন কোন গ্রহতে প্রাণের সূচনা ও লালিত হবার সুযোগ খুব কম। আবহাওয়া সহনশীল গড় তাপমাত্রার থাকতে হবে। ঋতুর পরিবর্তনের প্রভাব সহ্যসীমার মধ্যে থাকতে হবে। সূর্য থেকে নিরাপদ দূরে থাকতে হবে। গ্রহটার অবশ্যই পরিমাপমত ভর থাকতে হবে। তার পরিমান এমন হতে হবে যেন বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে। নতুন প্রাণের উদ্বোধনকে স্বাগত জানানোর জন্য আবহাওয়ামণ্ডলে সঠিক পরিমাণে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণ থাকতে হবে। নববিকশিত প্রাণকে মহাজাগতিক আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি ও অন্যান্য ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে রক্ষা করার জন্য সঠিক ঘনত্বের হতে হবে। আর অবশ্যই এ ধরণের গ্রহে জল থাকতে হবে।

সৌরজগতের নয়টা গ্রহের মধ্যে এই সব উপাদানের সঠিক সমন্বয় ঘটেছে মাত্র একটা গ্রহে। এটা আমি নিশ্চিত যে শুধুমাত্র হঠাৎ করে এমনটা ঘটে গেছে। অন্য সৌরজগতের কত ভাগ গ্রহের আবহাওয়া মণ্ডলে রাসায়নিক দ্রব্যের এমন সঠিক মিশ্রণ আছে। দশের মধ্যে এক, একশতর মধ্যে এক অথবা এক লক্ষের মধ্যে এক ভাগ, আপনারা কত ভাগ আশা করেন? একটি মাত্র উদাহরণকে সামনে রেখে সীমাহীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা সত্যিই কঠিন। উপরে উল্লিখিত ভগ্নাংশগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মহাবিশ্বের খুব কম গ্রহ সেটি প্রজেক্টের নাগালে রয়েছে। বুদ্ধিমান প্রাণীর বিকাশ হয়েছে এমন গ্রহের শতকরা হার কত ধরা উচিত?

পদার্থবিজ্ঞানীরা সম্পূর্ণ বিষয় সম্পর্কে জীববিজ্ঞানীদের চাইতে ভিন্ন উত্তর দেবে। তারা প্রাণীবিজ্ঞানীদের চাইতে আরও নিখুঁতভাবে বর্ণনা দেবেন। তারা এটা বলে অভ্যস্ত যে, যদি কোন প্রাণের উদ্ভব ঘটে, তাহলে তা অবশ্যই বুদ্ধিজ্ঞানসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা এ ধরণের অগ্রগতির অসম্ভাব্যতা নিয়ে বরং বিস্মিত।

পৃথিবীতে জীবনের সৃষ্টি হয়েচে ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে। কিন্ত ৫ লক্ষ বৎসরের আগে উচ্চবুদ্ধির বিকাশ ঘটেনি। যদি পৃথিবী ওই ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর ধরে ঠাণ্ডা থাকত। কিংবা একটু বেশি গরম হত তাহলে বুদ্ধিমান প্রাণীর উদ্ভব কোনমতে সম্ভব হত না। এই প্রশ্নে উত্তর যখন খোঁজা হয়, তখন একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। পদার্থের নিয়ম অনুযায়ী বা রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে জীবন কখনও সোজাসুজি বুদ্ধিমত্তার দিকে এগিয়ে যায়নি।

বিবর্তনের পথ খুবই জটিল। একটি গাছে যত শাখাপ্রশাখার বিন্যাস আছে তার চাইতেও জটিল। জীবনের উদ্ভবের পরপর অর্থাৎ ৩.৮ বিলিয়ন বৎসর আগে জীবন ২ বিলিয়ন বৎসর ধরে শুধু গঠিত হচ্ছিল। শুধু একটা সাধারণ প্রাথমিক নিউক্লিয়াস ছাড়া কোষ তৈরি হতে এতগুলো বৎসর লেগেছিল। এই ব্যাকটেরিয়ার মত বস্তুগুলো ৫০ থেকে ১০০টি ভিন্ন রকম (হয়তো আরও বেশি রকম) পথে বিকশিত হয়েছিল। এই বিশাল সময়ে তাদের কেউ বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী হয়নি। বিস্ময়কর ব্যাপার হল এমন কি আজ পর্যন্ত এই ঘটনাকে আংশিকভাবে বর্ণনা করা হয়। ১,৮০০ মিলিয়ন বৎসর আগে সুগঠিত নিউক্লিয়াস এবং অন্যান্য উচ্চতর বৈশিষ্ট্যের প্রত্যঙ্গ নিয়ে প্রথম Eukaryote গঠিত হয়। protists ভর্তি ওই পৃথিবী থেকে তিন ধরণের বহুকোষী জীবনের বিকাশ ঘটেছিল। ফাংগাই, উদ্ভিদ এবং প্রাণী। কিন্তু লক্ষ প্রকার ফাংগাই বা উদ্ভিদ কোন বুদ্ধিমত্তার জন্ম দিতে পারেনি।

প্রিক্যামব্রিয়ান এবং ক্যামব্রিয়ান যুগে প্রাণীরা (মেটাজোয়া) ৬০ থেকে ৮০টি ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। এর ধ্যে শুধুমাত্র কর্ডাটা প্রাণীরা সত্যিকারের বুদ্ধির অধিকারী হয়েছে। কর্ডাটা হল সবচেয়ে পুরাতন এবং বৈচিত্র্যময় দল। কিন্তু এই বিরাট সংখ্যক দল-উপদলের মধ্যে শুধুমাত্র Vertebrates রা বুদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। মাছ, এম্ফিবিয়ান, সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী নানারকমের উপদল নিয়ে এই ভারটেব্রা দল গঠিত। এর মধ্যে শুধুমাত্র একটি প্রকার স্তন্যপায়ীরা উচ্চমাত্রার বুদ্ধির অধিকারী হয়েছে। ট্রায়াসিক যুগ থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ীদের এক লম্বা ইতিহাস আছে। কিন্তু টারসিয়ারি যুগের শেষে অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ মিলিয়ন বৎসর আগে স্তন্যপায়ীদের ২৪ প্রজাতির মধ্যে মাত্র একটির মধ্যে বুদ্ধির উদ্ভব ঘটেছে।

প্রায় ৩ মিলিয়ন বৎসর আগে হোমিনিডদের মাথায় মগজের পরিমাণ বাড়তে থাকে। হোমো সেপিয়েন্সদের সুষুন্মাকাণ্ড (Cortex) তৈরি হয় ৩০০০০০০ বৎসর আগে। মিলিয়ন মিলিয়ন শাখা প্রশাখার বুদ্ধি অর্জনের ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে উচ্চমাত্রার বুদ্ধির অধিকারী হওয়া সত্যিই কঠিন। জীবনের উদ্ভব থেকে আজ পর্যন্ত কতগুলো প্রজাতি টিকে আছে? আমাদের গ্যালাক্সিতে যতগুলো গ্রহ আছে তার সংখ্যার চেয়েও বেশি। যদি এর অন্তত মিলিয়ন প্রজাতি জীবিত থাকে আর প্রত্যেকের টিকে থাকার গড় সময় যদি ১০০০০০ বৎসর হয়, তাহলে তার সংখ্যা বিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়। হয়তো জীবনের সূচনা থেকে ৫০ বিলিয়ন প্রজাতির চেয়েও বেশি প্রাণীর জন্ম হয়েছিল। সভ্যতা গড়তে পারার মত বুদ্ধি এদের মধ্যে মাত্র একটি প্রজাতি অর্জন করতে পেরেছে। আসলে প্রাণীদের মধ্যে এত বেশি বিচিত্রতা ছিল যে সঠিক হিসাব বের করা খুব কঠিন। এক বিশাল সংখ্যক প্রজাতির জন্ম ও বিকাশ হয়েছি। প্যালেন্টলজিস্টরা দেখেছেন বেশি ছড়িয়ে পরা, জনবহুল প্রজাতিগুলো লক্ষ লক্ষ বৎসর বেঁচে ছিল। এর সবগুলো আসলে অনন্য ঘটনা নয় বরং অস্বাভাবিক ঘটনা।

উচ্চমাত্রার বুদ্ধি খুঁজে পাওয়া দুস্কর কেন?
সুনির্বাচিত অভিযোজনগুলো যেমন 'চোখ' স্বাধীনভাবে শক্তিশালী হয়েছে। উচ্চমাত্রার বুদ্ধি শুধু একবার তৈরি হয়েছে। শুধুমাত্র মানুষের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে। এই অসাধারণ ঘটনার স্বপক্ষে আমি মাত্র দুইটা কারণ দেখতে পারছি। প্রথমত প্রাকৃতির নির্বাচন দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তি সবসময় আনুকূল্য পায় না। অন্তত: আমরা যেমন আশা করি তেমন নাও ঘটতে পারে। আসলে অন্য সব ধরণের জীবিত প্রাণী তথা লক্ষ লক্ষ প্রজাতির উচ্চমাত্রার বুদ্ধি ছাড়াই ভাল আছে।

মানুষের প্রকার শিম্পাঞ্জীর প্রকার থেকে ৫ মিলিয়ন বৎসর আগে আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু ৩০০০০০ বছরের আগে মানুষের মগজ বড় হয়নি। স্ট্যানলি'র (১৯৯২) মতে বুদ্ধির বিকাশের শেষ পর্যায়ে অসহায় বাচ্চাকে বহন করার জন্য মায়েদের হাতের তৈরি হওয়া প্রয়োজন ছিল। বেশি বুদ্ধির জন্য বড় মগজ প্রয়োজন। হোমিনিড প্রজাতিদের মগজ জীবন পরিক্রমার শেষ ৬ ভাগেরও কম সময়ে বিকশিত হয়েছে। এতে মনে হয় উন্নত মানের বুদ্ধি তৈরির জন্য কিছু অনুকূল উপাদানের এক বিরল মিশ্রণ এর প্রয়োজন (Mayr 1994)।

সভ্যতা সৃষ্টির জন্য কি পরিমাণ বুদ্ধির প্রয়োজন?
আমরা জানি প্রাথমিক স্তরের কিছু বুদ্ধি ইতিমধ্যে পাখি (দাঁড়কাক, তোতা) এবং কিছু স্তন্যপায়ী (মাংশাসী, শুশুক, বানর) এবং এ ধরণের যারা আছে তাদের মধ্যে পাওয়া গেছে। কিন্তু এদের মধ্যে কেউ সভ্যতা তৈরি করার মত বুদ্ধি অর্জন করতে পারেনি।

সব সভ্যতাই কি মহাশূন্যে বেতার তরঙ্গ নিক্ষেপ করতে বা মহাশূন্য থেকে আসা তরঙ্গ গ্রহণ করতে সক্ষম?
এর সোজাসুজি উত্তর হল 'না'। গত ১০,০০০ বৎসরে পৃথিবীতে কমপক্ষে ২০টি সভ্যতা এসেছিল। ভারতীয়, সুমেরীয়সহ নিকট অতীতে প্রাচ্যসভ্যতাসমূহ, প্রাচীন মিশর, গ্রিক এবং সমস্ত ইউরোপীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে মায়া, আজটেক, ইনকা এবং বিভিন্ন রকমের চৈনিক বা ভারতীয় সভ্যাতার কোনটি এতদূর অগ্রসর হতে পারেনি। এদের মধ্যে মাত্র একটি সভ্যতা প্রযুক্তিকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে যে তারা মহাকাশে বেতার তরঙ্গ নিক্ষেপ করতে এবং মহাকাশ থেকে আসা বেতার তরঙ্গ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে।


ভিন্নগ্রহের প্রাণীদের ইন্দ্রিয় কি আমাদের পাঠানো তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ বুঝতে পারবে?
নিশ্চিতভাবে এর নাবোধক উত্তর দেয়া যায়। পৃথিবীতেও এমন কিছু শ্রেণী আছে যাদের শ্রবণশ্তি বেশ উঁচু মাত্রার কিংবা বিভিন্ন রাসায়নিক প্রভাবে তারা অতিদ্রুত সাড়া দেয় কিন্তু তারা কোন তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কোন উদ্ভিদ এমনকি কোন ছত্রাকও বৈদ্যুতিক তরঙ্গকে গ্রহণ করে না। যদি অন্য কোন গ্রহে কোন উচ্চশ্রেণীর প্রাণী থেকেও থাকে তাহলে তাদের জৈবিক অগ্রগতি আমাদের চাইতে খুব বেশি কিছু হবে না।

কোন সভ্যতা ঠিক কতদিনব্যাপী তরঙ্গ গ্রহণে সক্ষম হবে?
প্রত্যেক সভ্যতার জীবনকাল কম হয়। এ বিষয়টার উপর জোর দিয়ে একটি ছোট্ট গল্প বলি।
ধরি, আমাদের গ্যালাক্সির বাইরে কোন গ্রহে সত্যিই কোন বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। শত কোটি বৎসর আগে তাদের মহাকাশবিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে আবিষ্কার করল। তারা বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর বলল যে, এই গ্রহটি প্রাণের বিকাশের জন্য সবদিক দিয়ে উপযুক্ত। এই ধারণা পরীক্ষা করার জন্য তারা শতকোটি বৎসর ধরে পৃথিবীতে বিভিন্ন সিগন্যাল পাঠাল। কিন্তু কোন উত্তর না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ১৮০০ সালে (আমাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী) তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, আর মাত্র ১০০ বৎসর সিগন্যাল পাঠানো হবে। ১৯০০ সালের মধ্যে কোন উত্তর না পেয়ে তারা সিদ্ধান্ত নিল যে পৃথিবীতে কোন বুদ্ধিমান প্রাণী নেই। এভাবে ভাবলে দেখা যায় যে সত্যিই যদি মহাবিশ্বে হাজার হাজার সভ্যতা থেকেও থাকে তাহলেও তাদের সাথে সফল যোগাযোগের সম্ভাবনা খুব কম। আসলে "খোলা দুয়ারের স্থায়ীত্ব বড়ই ক্ষীণ"।

সকলেই জানেন যে সেটি'র বিস্তৃতিশক্তি ততোটা বেশি না। সেটি নিক্ষেপিত সিগন্যাল আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সির সীমানার মধ্যেই থাকে। কিন্তু সত্যি ঘটনা হল মহাবিশ্বে আরও অসংখ্য সংখ্যক সমান বৈশিষ্ট্যের গ্যালাক্সি আছে। সেটি প্রজেক্টের এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতনতা সত্ত্বেও এখনও এই গ্যালাক্সিগুলোর নিকটবর্তী হতে পারেনি।

উপসংহার
এই যুক্তি ও বিশ্লেষণ থেকে আমরা কি উপসংহার টানতে পারি? আলোচিত শর্তগুলোর আটটার মধ্যে ছয়টার বেশি পূরণ করা সেটি'র জন্য পুরোপুরি অসম্ভব। আর যদি এই শর্তগুলো ছয়টার কয়েকগুণ বেশি হয় তাহলে সেটি'র অসম্ভাব্যতা মহাবিশ্বের সীমার সমান হয়ে পড়বে।

তা সত্ত্বেও সেটি'কে এখনও প্রস্তাব করা হচ্ছে কেন?
কেউ যদি খোঁজ করে তাহলে দেখবে যে সেটি'র সাথে যারা জাড়িত তারা কেউ মহাকাশবিজ্ঞানী, কেউ পদার্থবিদ আবার কেউ বা প্রযুক্তিবিদ। সেটি'র সাফল্য যে কোন পদার্থবিদ্যার সূত্র বা প্রযুক্তির নিয়মের উপর নির্ভর করে না এ বিষয়ে তারা সচেতন নন। সেটি'র উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে জীববৈজ্ঞানিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সেটি প্রজেক্টের যে কোন সম্ভাব্য সাফল্য বাস্তবের মুখ দেখবে না।


আর্নেস্ট মেয়রঃ শতকের অন্যতম প্রধান জীববিজ্ঞানী। তিনি প্রাণীবিজ্ঞানের Alexander Agassiz অধ্যাপক। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। ৬৫০টি পেপার এবং ২০টি বই লিখেছেন। পাখিবিজ্ঞান এবং শ্রেণীবিন্যাস বিদ্যা বিশারদ হিসেবে তিনি সুপরিচিত। বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। তিনি সাধারণত জনসংখ্যা ও জীববৈচিত্রের ভিত্তিতে প্রজাতির উন্নয়ন বিষয়ে লেখালেখি করেন। সম্প্রতি তিনি সেটি (SETI) বিষয়েও লেখালেখি শুরু করেছেন।

মূললেখা
Read More ... »

May 13, 2009

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোন বিজ্ঞান শিখছে শিশুরা?

নাহিদ নলেজ

প্রাথমিক শিক্ষা কী- এ সম্পর্কে বিস্তর কথাবার্তা আমাদের সকলের জানা। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে নতুন কিছু বলা অযথা প্যাঁচাল পারার সমান । সেই প্রাথমিক শিক্ষাটুকুই যদি গলদপূর্ণ হয়, তাহলে আর কী কথা থাকে! যে দেশের অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর, যে দেশের অধিকাংশ শিশুই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত হবার আগেই ঝরে পড়ে, সে দেশের পুরো চিন্তার জগৎ, জনগণের বৌদ্ধিক স্তর, তার রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির হালহকিকত কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ-সেই ভবিষৎ-ই বা কেমন হবে?

বিজ্ঞানচেতনা, নবম বর্ষ, প্রথম-দ্বিতীয় সংখ্যা, জানুআরি-জুন ২০০৪এ প্রকাশিত ‘বিজ্ঞানের প্রচলিত পাঠ্যপুস্তক গুলো কি বিজ্ঞানমস্কতা সৃষ্টিতে সহায়ক ’ শিরোনামে মাহবুবুর রহমানের লেখা প্রবন্ধটিই খুব সম্ভব একমাত্র প্রবন্ধ যেটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের পাঠ্য পুস্তক নিয়ে লেখা। হয়তো আরো লেখা থাকতে পারে, যা আমার পড়া হয়ে ওঠেনি । এদেশের যারা পন্ডিত মানুষ, তাদের কর্তব্য আমাদের মত যারা সরকারী- বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাদের জানাবোঝাকে বিকশিত করা, সর্বোপরি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের বিজ্ঞানকে সঠিক ভাবে হাজির করার ব্যাপারে নীতি প্রণয়ণে রাজী করানো। আমাদের রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক চাকুরী বিধি অনুযায়ী নিচু কর্মচারীদের হাত-পা বাঁধা । অনেকেই জানলেও সঠিক কথাটি বলার লেখার সুযোগ নেই । ফলে একটি বে-সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমার সামান্য জানাবোঝা থেকে বাচ্চাদের পড়াতে গিয়ে শুধুমাত্র পঞ্চম শ্রেণীর বিজ্ঞানের বইয়ের যেসব ত্রুটি আমার চোখে পড়েছে, তার কয়েকটি মাত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যারা ভালো ভাবে কাজটা পারতেন তারা করেননি বলে স্বল্পজ্ঞান নিয়ে কাজটি করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞান কী? ‘বিজ্ঞান হচ্ছে বিশ্বজগৎ সম্পর্কে যুক্তিসমৃদ্ধ,পরীক্ষণ সম্ভব, ব্যক্তি- নিরপেক্ষ জ্ঞান।’ যুক্তিসমৃদ্ধ অর্থ হলো বিজ্ঞানের যুক্তি প্রয়োগের চারটি পদ্ধতির কোনো একটি ব্যবহার করা হয়েছে। পরীক্ষণ-সম্ভব অর্থ হলো বিজ্ঞানী নিজে যে পরীক্ষণ করেছেন অন্যরা তা যাচাই করতে পারবেন। পৃথিবীর যে কোন গবেষনাগারে সে পরীক্ষণের ফল একই হবে। ব্যক্তি-নিরপেক্ষ অর্থ হলো গবেষকের ধর্ম বা দার্শনিক মতের সাথে বৈজ্ঞানিক সূত্র বা বর্ণনা সম্পর্কহীন হবে।

কোন বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের পিছনে থাকে তিনটি বিষয়ঃ (১) সামাজিক শর্ত বা চাহিদা (২) আইডিওলজি ও (৩) প্রতিভা। এ সম্পর্কে মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হচ্ছে সামাজিক চাহিদা । কৃষি জমি ভাগ বাটোয়ারার প্রয়োজন থেকেই মিশরে জ্যামিতির উদ্ভব ঘটে। মিশরে আবাদ যোগ্য জমির তীব্র চাহিদা থেকেই এ অঞ্চলে জ্যামিতির উদ্ভব ঘটেছে। আধুনিক মিশরের ১০ শতাংশেরও কম ভূমি আবাদ যোগ্য এবং প্রাচীন মিশরে শুধু নীল নদে বন্যার পর জমিতে আবাদ করা যেতো , অন্য সময়ে নয়। যে বছর নদীতে বন্যা হত না, সে বছর নিষ্ফলা যেত।

জ্যামিতি শব্দের অর্থ জমি পরিমাপ (গ্রীক গেওমিয়েত্রিয়া) যা এ মতকেই সমর্থন করছে। ইউক্লিড ছিলেন বর্তমান মিশরের আলেজান্দ্রিয়ার অধিবাসী । ভূমি পরিমাপের প্রয়োজন থেকেই মিশরে ইউক্লিডের মতো জ্যামিতি বিশারদের আর্বির্ভাব ঘটেছে।

সাম্প্রতিক একটা উদাহরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ ওয়াহিদউজ্জামান এবং তাঁর সহকারীরা আবিস্কার করেছেন; হেলেঞ্চা, দূর্বাঘাস, মালঞ্চ,ফার্ণ, প্রভৃতি উদ্ভিদ মাটি থেকে আর্সেনিক শুষে নেয়। আর্সেনিক দূষিত এলাকায় এরকম ঘটে। বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত এবং প্রতিকারের উপায় খুঁজছে সেসব দেশেই এ আবিস্কার ঘটা সম্ভব। অর্থাৎ সামাজিক শর্ত নির্ধারণ করে আবিষ্কারের প্রকৃতি। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একই সামাজিক শর্ত বিদ্যমান থাকতে পারে। সেজন্য বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখা যায়,একই আবিষ্কার নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন একাধিক বিজ্ঞানী। র্চালস ডারউইন এবং রাসেল ওয়ালেস স্বতন্ত্রভাবে জৈব বিবর্তনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বে উপনীত হয়েছেন। লাইবনিৎস ও নিউটন স্বতন্ত্রভাবে ক্যালকুলাস আবিস্কার করেছেন। সামাজিক শর্ত অনুপস্থিত থাকার কারণেই আর্কিমিডিস ক্যালকুলাসের জনক হতে পারেন নি। ক্যাথোড রশ্মির ধর্ম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে রান্টজেনের মতো অন্য বিজ্ঞানীও এক্স-রে আবিস্কার করে বসেছেন। অনেক সময় তাঁরা বুঝতে পারেন নি কেন ফটোগ্রাফিক প্লেট নিজে নিজে এক্সপোজড হয়ে গেল (যেমন; স্যার উইলিয়াম ক্রক্স)। জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী ফিলিপ লেনার্ড স্বতন্ত্রভাবে এক্স-রে আবিস্কার করেন এবং রান্টজেনের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ নিয়ে আসেন। হিটলারের সময় পদার্থ বিজ্ঞানের বই-এ এক্স-র এর পরিবর্তে লেনার্ড -রে লেখা হতো। ইউক্রেনের পদার্থ বিজ্ঞানী আইভান পাওলোভিচ পুলুজ রান্টজেনের ৬ বছর আগে ১৮৮৯ সালে লক্ষ্য করেন ক্যাথোড রে-এর পাশে ফটোগ্রাফিক প্লেট রাখা হলে তা নিজে নিজে এক্সপোজড হয়ে যায়। কিন্তু এ পর্যবেক্ষণকে ব্যাখ্যা করে এক্স-রে বা নতুন কোনো রশ্মি আবিস্কার তিনি করতে পারেন নি। আসলে সঠিক আইডিওলজির অভাবে পুলুজ নুতন এ রশ্মি আবিস্কার তিনি করতে পারলেন না। একই কথা বলা যায় স্যার ইউলিয়াম ক্রুক্স-এর ক্ষেত্রে । ক্যাথোড রশ্মি বাতাসের মধ্যে চলতে পারে। কোন রশ্মি ফটোগ্রাফিক প্লেটকে এক্সপোজড করতে পারে, তারা সে চিন্তা করতে পারেন নি। কিন্তু রান্টজেন চিন্তা করেছিলেন নতুন কোন রশ্মি এ ঘটনা ঘটাচ্ছে যা বাতাসের মধ্য দিয়ে চলতে পারে।

ক্রুক্স, পুলুজ এবং রান্টজেনের সামাজিক শর্ত এক হলেও আইডিওলজির ক্ষেত্রে পার্থক্য ছিল। আইওলজি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক মতবাদ বা ধারণা যার উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানী কাজ করেন। যখন কোন মতবাদ সমগ্র বৈজ্ঞানিক সমাজের কাজের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে বলে প্যারাডাইম। টলেমির পৃথিবী-কেন্দ্রিক সৌরজগতের মডেল একটি মতবাদ। বিজ্ঞানের প্রাচীন এবং মধ্যযুগের বেশিরভাগ সময় জুড়ে তা ছিল প্যারাডাইম। সঠিক আইডিওলজি ছাড়া কোনো বৈজ্ঞানিক আবিস্কার সম্ভব নয়। ক্যাথোড রশ্মির ধর্ম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জে.জে. টমসন ইলেক্ট্রন আবিস্কার করেন। কিন্তু রান্টজেনের পক্ষে কোনদিন ইলেকট্রন বা প্রোটন আবিস্কার করা সম্ভব ছিল না। কারণ রান্টজেনের প্যারাডাইম ছিল ডালটনের পরমাণুবাদ। ডালটনের পরমাণুবাদ অনুসারে পরমাণু অবিভাজ্য । রান্টজেনের পক্ষে পরমাণুর চেয়ে ক্ষুদ্র কণিকা কল্পনা করা সম্ভব ছিল না। ১৮৯৭ সালের ইংরেজ বিজ্ঞানী জে.জে. টমসন যখন ইলেক্ট্রন আবিস্কার করলেন, রান্টজেন ইলেক্ট্রনকে অস্বীকার করলেন। উর্জবুগ-এ তাঁর গবেষণাগারে ইলেক্ট্রন শব্দটি নিষিদ্ধ ছিল। রান্টজেনের সামনে তাঁর সহকারীরা ইলেক্ট্রন নিয়ে আলোচনা করতেন না। পরে রান্টজেন যখন মিউনিখে বদলী হলেন এ নিষেধাজ্ঞা সেখানে বলবৎ হলো।
বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের জন্য তৃতীয় পর্যায়ে মেধার প্রয়োজন । প্রথম দুটো শর্ত অনুপস্থিত থাকলে শত প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর পক্ষেও আবিস্কার করা সম্ভব নয় । আসলে বিজ্ঞানের ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা গৌণ। কিন্তু জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বইতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয় প্রতিভার উপর । বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে গিয়ে মহামানব বা নায়কের জন্ম দেয়া হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গিটি পুরোপুরি মধ্যযুগীয় বা সামন্ততান্ত্রিক । ব্যক্তিকে বেশি কৃতিত্ব দিতে গিয়ে অনেক সময় ইতিহাসবিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। এ কথা ভুলে যাওয়া হয়, বিজ্ঞানের কোনো আবিস্কার ইতিহাসবিচ্ছিন্ন নয় ।’ বিজ্ঞান চেতনা পৃষ্ঠা ১৭-১৮, নবম বর্ষ ,প্রথম-দ্বিতীয় সংখ্যা, জানুয়ারি-জুন ২০০৪, ।

আমরা আমাদের আলোচনার জন্য শুধুমাত্র পঞ্চম শ্রেণীর‘ পরিবেশ পরিচিতি বিজ্ঞান’ বই থেকে এ রকম অজস্র উদাহরণ তুলে দিয়ে দেখানো সম্ভব কীভাবে সামাজিক শর্ত ও আইডিওলজির জায়গা বাদ দিয়ে বিজ্ঞান কে বিশ্বাস হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক ২০০৬ শিক্ষা বছর থেকে পঞ্চম শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক রূপে নির্ধারিত ‘পরিবেশ পরিচিতি বিজ্ঞান’ বইয়ে প্রথম অধ্যায়ে তৃতীয় পৃষ্ঠা থেকে পঞ্চম পৃষ্ঠায় ছক ২: উদ্ভিদের শ্রেণী বিন্যাসঃ অপুষ্পক ও সপুষ্পক ও ছক ৩: অপুস্পক উদ্ভিদের শ্রেণী বিন্যাসঃ শৈবাল,ছত্রাক, মশ ও ফার্ণ- এ বলা হয়েছে,‘ এরা খাদ্য তৈরী করে কি? আলো পছন্দ করে কি?’-এই বাক্যটি পড়লে যে কারো মনে হতে পারে এইসব উদ্ভিদের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতার ব্যাপারে আছে। যেমন বলা হয় রহিম ভাত খায় কি, আলো পছন্দ করে কি ইত্যাদি।

তৃতীয় অধ্যায় ‘প্রাণীজগৎ’ পৃষ্ঠা -২১ এ বলা হয়েছে, ‘পামরী পোকা, লেদাপোকা, বিছা পোকা, ক্ষুদে মাকড় ইত্যাদি ফসলের ক্ষতি করে। এরা ক্ষতিকর পতঙ্গ।’ এখানেও এই আগের সমস্যা। এইসব পতঙ্গ যেন মানুষের পূর্ব জন্মের শত্রু। তাছাড়া ক্ষতিকর পতঙ্গ উপকারী পতঙ্গ- এইসব শব্দ বিজ্ঞানের বইয়ের সঙ্গে যায় না। একই অধ্যায়ে ২৫ পৃষ্টায় বলা আছে, ‘স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে মানুষ সর্বাপেক্ষা উন্নত। মানুষ কথা বলতে পারে। মানুষের মস্তিস্ক বা মগজ অন্যসব প্রাণীদের চেয়ে বড় ও উন্নত। হাত মুঠো করে কোন কিছু আঁকড়ে ধরতে পারে। দু’পায়ে ভর করে দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারে। মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী। এ কারণে মানুষকে প্রাণী জগতের শ্রেষ্ঠ প্রাণী বলা হয়। ’-এই বাক্য কয়টি পড়ার পর মনেই হবে না , এগুলো বিজ্ঞানের বইয়ের ভাষা। মানুষ কেন কথা বলতে পারে, কেন মানুষের মস্তিষ্ক অন্য প্রাণীর চেয়ে বড় ও উন্নত হলো, তা বলা নেই। উপরন্তু হাত মুঠো করা ও দুপায়ে দাঁড়াতে হাটতে পারা পড়ে মনে হয় বোধহয় মানুষই একমাত্র প্রাণী যারা ওই কাজগুলো পারে। আবারও একই অধ্যায়ের ২৬ পৃষ্টায় প্রাণীর অভিযোজন অংশে বলা হয়েছে, ‘এ প্রাণীগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এরূপ পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ’-এ লাইনটি পড়ে কি মনে হয় না, যে প্রাণীগুলোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কারো নির্দেশে তাদের পরিবেশ অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়েছে?

এবং পঞ্চম অধ্যায় ‘স্বাস্থ্যবিধি’ পৃষ্ঠা ৫৪ তে আছে, ‘এইচআইভি (HIV) ভাইরাস মানুষের দেহের রক্তে প্রবেশ করে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়।’ এই রকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে, যার মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে-কীরকম উদ্দেশ্যবাদী বিজ্ঞান শিক্ষা আমাদের শিশুরা পাচ্ছে। এই উদ্দেশ্যবাদী বর্ণণা আমাদের শেখায় প্রাণীজগৎ অবচেতন ভাবে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কাজ করে। যে সমাজে, রাষ্ট্রে এরকম উদ্দেশ্যবাদী বিজ্ঞানচর্চা থাকে, অর্থাৎ আইডিওলজিক্যাল সংকট থাকে, সেখানে বিজ্ঞানের বিকাশ কতটুকু সম্ভব ?

বিবর্তনের মতবাদের ইতিহাসে ডারউইন পূর্ববর্তী বিজ্ঞানীদের মধ্যে সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস (১৭০৭-১৭৭৮) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য । বিবর্তনের কোনো মতবাদ আবিস্কৃত হবার সামাজিক শর্ত সে সময় উপস্থিত ছিল। লিনিয়াস ছিলেন অসামান্য প্রতিভাবান । শুধু সঠিক আইডিওলজির অভাবে তিনি কোনো মতবাদ আবিস্কার করতে সক্ষম হন নি। বাইবেলে ছিল তাঁর প্রচন্ড আস্থা। তিনি কাজ করেছেন যেন এক ধর্মবিদের সাথে, যিনি বাইবেলে উল্লেখিত ভেষজ ও উদ্ভিদ নিয়ে একটি বই লিখেছেন।

ডারউইনের মতো তিনিও জীববৈজ্ঞানিক অভিযানে গিয়ে ছিলেন ল্যাপল্যান্ডে । সেখানে যোগাড় করেছেন বহু নমুনা, এঁকেছেন একরাশ ছবি ও সংগ্রহ করেছেন বহু তথ্য । তবুও তিনি পারেন নি। কারণ আইডিওলজিক্যাল ঘাটতি। আমরাও কি আমাদের সন্তানদের এই ঘাটতির মধ্যে রেখে দিতে চাই? এই ঘাটতির কারনেই আমাদের বিজ্ঞানের ছাত্ররাই মৌলবাদী রাজনিতিতে যুক্ত হয় বেশি। বিজ্ঞানী বের না হয়ে কেরানী হয়। এ বছর সারা দুনিয়ায় চার্লস ডারউইনের দ্বিশততম জন্ম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে উৎসবের সাথে অথচ আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ,স্কুলে, কোন অনুষ্ঠান হলোনা। আজ নারী নীতি নিয়ে যে এত কথা বার্তা,নারী পুরুষের সম্পর্কে যে ঘাটতি,তার মূলেও ওই আইডিওলজিক্যাল ঘাটতি,সমাজ ও উৎপাদন সম্পর্কের ক্রমবিকাশকে না বোঝা। তাই আসুন শুধু অসংগতি ধরিয়ে দেওয়াই নয়, আদর্শ বিজ্ঞানের পাঠ্য বই কেমন হবে, তার রূপরেখাও দাঁড় করাই । তাতে বাংলাদেশও অনেকখানি দাঁড়িয়ে যাবে।


লেখকঃ শিক্ষক, ক্ষুদে পন্ডিতের পাঠশালা,
চিলমারী, কুড়িগ্রাম।
Read More ... »

Nov 10, 2008

ভাগ্য বা অদৃষ্টবাদ প্রসঙ্গে- ২য় অংশ

শিবাজি দে
সহকারী অধ্যাপক
আব্দুলপুর সরকারি কলেজ, নাটোর।

পূর্ব প্রকাশের পর......

মুসলিম ধর্মমতেও মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার প্রশ্ন, প্রজ্ঞা ও প্রত্যাদেশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব- এসব নিয়ে নানা মতের ফলে নানা সম্প্রদায়ের উদ্ভব দেখা যায়। বিশেষ করে অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস নিয়ে, পক্ষে ও বিপক্ষে দুটো চেতনা নিয়ে মুসলিম ধর্মতত্ত্বে দুটো পরস্পরবিরোধী সম্প্রদায়ের উদ্ভব দেখা যায়। এরা হলো- জাবারিয়া ও কাদারিয়া সম্প্রদায়।

জাহস বিন সাফাওয়ান (মৃত্যু- ৭৪৫) এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। আরবি জাবর শব্দ হতে জাবারিয়া শব্দের উদ্ভব। জাবর শব্দের অর্থ হচ্ছে বাধ্যতা, নিয়তি বা অদৃষ্ট। অদৃষ্টে বা আল্লাহর সর্বময় ইচ্ছায় বিশ্বাস করার জন্য এই সম্প্রদায় জাবারিয়া সম্প্রদায় নামে পরিচিত। তাদের মতে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি। মানুষ তার হাতের ক্রীড়নক মাত্র। জাবারিয়া সম্প্রদায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সর্বময় কর্তৃত্বের ক্ষমতার উপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। জাবারিয়াগণ সম্পূর্ণরূপে ইচ্ছার স্বাধীনতা অস্বীকার করেন। সব কাজ আল্লাহ্‌র নিকট হতে আসে। মানুষের কোন কার্য নির্বাচন করার ক্ষমতা বা শক্তি নাই। মানুষ আল্লাহর ইচ্ছার নিক সম্পূর্ণ অসহায়। জগতের প্রতিটি কার্য ও ঘটনা আল্লাহর নির্দেশে সংঘটিত হচ্ছে। মানুষের কোন ইচ্ছার স্বাধীনতা নেই। সে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর সার্বভৌম শক্তির অধীন। মানুষের পুরস্কার ও শাস্তি আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার অন্তর্ভূক্ত। তিনি যাকে ইচ্ছা পুরস্কার দিবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেবেন। জাবারিয়া সম্প্রদায় তাদের মতবাদের সমর্থনে কোরআন থেকে কিছু আয়াতের উল্লেখ করেন। কয়েকটি আয়াত নিম্নে উল্লেখিত হলো-
(১) "আল্লাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন, কারণ তিনিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।" (সুরা-২, আয়াত-২৮৪)
(২) "তিনি যাকে ইচ্ছা সুপথে পরিচালনা করবেন।" (সুরা-২, আয়াত-২৭২)
(৩) "তিনি প্রত্যেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন এবং ভাগ্য নির্দেশ করে দিয়েছেন।" (সুরা-২৫, আয়াত ২২)

জাবারিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ কাদারিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। কাদারিয়া সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদগণ মানুষের কার্যক্ষমতা এবং ইচ্ছার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন। এদের মতে মানুষের কার্যক্ষমতা রয়েছে এবং তার সম্পাদিত কাজের জন্য সে নিজেই দায়ী। এরা অদৃষ্টবাদ সমর্থন করেন না; বরং বলেন মানুষ নিজেই তার কাজের কর্তা, নিয়ন্তা ও স্রষ্টা- মানুষ স্বেচ্ছায় ভাল বা মন্দ পথ অনুসরণ করে। মানুষের মধ্যে নীতিবোধ ও কর্তব্যবোধ রয়েছে, ফলে তার ইচ্ছার স্বাতন্ত্র্য ও কার্যের স্বাধীনতা রয়েছে। ভাল কাজ করলে সে পুরস্কার পাবে এবং মন্দ কাজ করলে শাস্তি পাবে। কাদারিয়া চিন্তাবিদগণ তাদের সমর্থনেও কোরআনের কিছু আয়াত নির্দেশ করেন। তার কয়েকটি আয়াত নিম্নে উল্লেখিত হলো-

(১) "যে ব্যক্তি পাপ করে, সে নিজ দায়িত্বেই তা করে। (সুরা-৪ , আয়াত- ১১১)
(২) "যে জাতি নিজের ভাগ্য নিজে পরিবর্তন করে না, আল্লাহও সে জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করেন না। (সুরা- ১৩, আয়াত- ১৯)
(৩) "যে যেমন কাজ করবে সে অনুরূপ ফল পাবে।" "মানুষ চেষ্টার অতিরিক্ত ফল পাবে না।" "তোমাদের যে মুসিবত ঘটে তা তোমাদেরই কৃতকর্মের ফল।" (সুরা- ৪২, আয়াত- ৩০)

খ্রিস্টান ধর্মমতেও আমরা নানাভাবে অদৃষ্টবাদের সমর্থন লক্ষ্য করি। যিশুর জন্মের পূর্বেই জগতের ত্রাতা যিশুর আগমনের সংবাদ অনেকের কাছে পৌঁছে যায়। ঈশ্বরই একমাত্র সর্বমঙ্গলময় সর্বশক্তিমান এবং সব কার্যের নিয়ন্ত্রক। পবিত্র বাইবেলে আছে "তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দয়া করেন, এবং যাকে ইচ্ছা, তাকে কঠিন করেন।" ঈশ্বর তার ইচ্ছানুযায়ী মানুষকে পুরস্কার কিংবা শাক্তি দিবেন। যিশুর মাধ্যমে সত্যের পথে এলে মানুষ চির আনন্দের সূত্র খুঁজে পাবে।

প্রচলিত ধর্মমতগুলির মধ্যে বৌদ্ধ এবং জৈব মতগুলোকে অদৃষ্টবাদী বলা যায় না। মূলতঃ এই মতগুলো মানুষকে তাদের সাধনা এবং কর্মের মাধ্যমে নির্বাণ বা মোক্ষলাভের কথা বলে। জৈন মতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো 'স্যাৎবাদ', যা খুবই আগহোদ্দীপক। এই স্যাৎবাদের কথা বলো, বস্তুসত্ত্বা বহুমূখী বলে আমাদের বস্তু সম্পর্কে প্রতিনি উক্তিই সম্ভাবনামূলক। প্রতিটি অবধারণ আপেক্ষিক ও বিশ্লেষণমূলক। বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে প্রতিটি বিকল্প সম্ভাবনাকেই স্বীকারা করা যায়। চূড়ান্ত সত্য কি? এই প্রশ্নের কোন মীমাংসা নাই। বস্তুর প্রকৃতি ও গুণাগুণ সম্পর্কে হ্যাঁ কিংবা না-বোধক যত বাক্যই উদ্ভাবন করি না কেন- সবই শর্তসাপেক্ষ এবং আপেক্ষিক। দেশ-কাল, দ্রব্য-পর্যায়, আকৃতি-প্রকৃতি প্রভৃতি অনেক ধরণের শর্ত আছে। সমস্ত যুক্তিবাক্যই এসব শর্তের অধীন। মূলতঃ জৈন-দর্শনে জ্ঞান ও সত্যের আপেক্ষিকতা এবং সম্ভাব্যতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এখানে অদৃষ্টবাদের মত কোন চূড়ান্ত সত্যের কথা বলা হয় না।

বৌদ্ধ ধর্মকথার মূল সত্য চারটি। এগুলো হলো----
(১) সকলই দুঃখময়।
(২) দুঃখের কারণ আছে।
(৩) দুঃখের নিরোধ সম্ভব।
(৪) দুঃখ নিরোধের সুনির্দিষ্ট উপায় আছে।

বুদ্ধ তার প্রজ্ঞা দ্বারা দেখেছিলেন, নাম রূপ সর্বস্ব এই জীবন অনিত্য, ক্ষণভঙ্গুর, অনাত্ম এবং দুঃখময়। অজ্ঞানতাই এই দুঃখের মূল কারণ। অবিদ্যাবশত মানুষ তাঁর প্রাকৃতিক বাসনা এবং সংস্কারের প্রভাবে পড়ে নিরন্তর জন্ম-মৃত্যুর ভবচক্রে আবর্তিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক বাসনা, কর্ম এবং সংস্কার কখনোই মানুষকে এই আবর্ত থেকে মুক্ত করে না। এই নৈরাশ্যবাদ থেকে মুক্তির উপায় নির্বাণলাভ। দুঃখ দৈন্য হতে সকল জীবের মুক্তির জন্য মৈত্রী ও করুণার দ্বারা একান্ত হৃদয়ে জীব সেবা করতে হবে। এভাবে দিব্য-অনুভব, অহিংসা কর্ম এবং নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে নাম-রূপ প্রবাহ নিরুদ্ধ হলেই নির্বাণ লাভ হয়। বুদ্ধমতেও মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় সমূহ চর্চা করে মুক্তিলাভের পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। বুদ্ধমতে আশাবাদই গুরুত্ব পেয়েছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও সেইসাথে নিরীশ্বরবাদী নানা মত বস্তুবাদী ও বহুত্ববাদী নানা দর্শনের প্রভাবে বর্তমানে সরাসরি অদৃষ্টবাদে সমর্থন (বিশেষভাবে বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে) কম দেখা যায়। বর্তমানে অনেকেই জ্যোতিষবিদ্যা বিশ্বাস করে না। তাছাড়া প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের আওতায় আসার যে শর্তাবলী তা না থাকায় জ্যোতিষবিদ্যা বিজ্ঞানের বাইরে প্রক্ষিপ্ত হয়। এসময়ে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য মতবাদ হিসেবে সম্ভাব্যতা অথবা আকস্মিকতার কথা মেনে নেয়া হয় পরিসংখ্যান বিদ্যার মাধ্যমে ঘটনাবলীর সাধারণ সূত্র নির্মাণে অনেকটাই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছানো যায়। বিজ্ঞানের দিক দিয়েও আপেক্ষিক সত্যকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। আধুনিক দর্শনেও অনেক অজ্ঞেয়বাদী মতবাদ দেখা যায়। ডারউইনের বিবর্তনবাদে আকস্মিকতার কথাই বলা হয়েছে। ডারউইনের মতে, জটিল জীবকোষগুলোতে আকস্মিক ও স্বতঃস্ফুর্ত পরিবতন দেখা দেয়, যার জন্য জীবদেহেরও পরিবর্তন দেখা দেয়। জীবকোষের আকস্মিক পরিবর্তন বংশানুক্রমে সংক্রমিত হয়। এই পরিবর্তন দেহের অনুকুল হলে জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকা যায়, আর প্রতিকুলে হলে সে জাতি ধ্বংস হয়। জীবন সংগ্রামে জয়ীরা প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যবিধান করে বেঁচে থাকে। তারাই যোগ্যতম। এভাবেই প্রকৃতিতে প্রাণীকূলের বিবর্তন এগিয়ে চলেছে। আবার হেনরী বার্গসও অন্যভাবে আকস্মিকতার কথা বলেন। তাঁর মতে প্রাণ-প্রবাহ হলো একমাত্র সত্তা। প্রাণপ্রবাহ অখণ্ড, অবিভাজ্য এবং গতিশীল। এর কোন ছেদ নেই। চলাই হচ্ছে এর মূলমন্ত্র। গতিই হচ্ছে নিখিল বিশ্বের চিরন্তন সত্য। প্রাণপ্রবাহ তার চলার পথে কেবল সৃষ্টি করে যায়। এ সৃষ্টি অতীত বা ভবিষ্যৎ কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। আবার মানবতাবাদীরা (প্রটোগোরাস থেকে মার্ক্স, রাসেল প্রমুখ) অন্যভাবে অদৃষ্টবাদকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তাদের মতে মানবকল্পিত ঈশ্বরে সর্বজ্ঞতা, সর্বশক্তিময়তা এবং অনন্ত করুনা আরোপ করলে মানুষের উপর নানাভাবে ব্যাপক অন্যায়, অপচয় এবং দুঃখের ব্যাখ্যা দেয়া দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে, শুধু তাই নয় ইতিহাসে এবং সমকালে মানুষের প্রত্যক্ষ দুরবস্থার কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজন মানুষের প্রত্যক্ষ দুরবস্থার কারণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োজন মানুষের কল্যাণে পরিবর্তন এবং তার দুঃখের কারণ নির্ণয় করে সেগুলোর অপসারণ। আধুনিক যুগে এসে প্রায় সবগুলো মতেই নিয়তিবাদ বা অদৃষ্টবাদের প্রভাব তাত্ত্বিকভাবে একেবারে নিঃশেষ হয়ে এসেছে। তবে মানুষ যে তার স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে পারে না, ভাগ্যের অধীনে না হলেএ - অন্যান্য প্রাকৃতিক শর্তাবলীর অধীনে, তা সব মতবাদই কোন না কোনভাবে মেনে নেয়।

ধর্মমতসমূহে, পুরাণগুলোতে কার্বে সাহিত্যে, অদৃষ্টবাদের নানা সমর্থন থাকলেও অতীতে অনেকে এর বিরোধীতা করেছে। আজকের যুগে তো কথাই নেই। ভারতীয় চার্বাকরা কিংবা গ্রীক বস্তুবাদীরা প্রাচীন যুগেই নিয়তিবাদের বিরোধীতা করেছে। মানুষ অদৃষ্টে বিশ্বাস করলেও তার মধ্যে এ বিষয়ে অনিশ্চয়তা আছে বলেই সে জীবন চালানোর জন্য বা বেঁচে থাকার জন্য কাজ করে। মানুষ তাদের নিজেদের এবং সমাজের উন্নয়নের জন্য খুব কঠিন বা কষ্টকর পদক্ষেপও নেয়। শুধু ভাগ্যের আশায় বসে থাকে না। সত্যিকারে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভাগ্যে বিশ্বাস কর্মত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়- যা থেকে দায়িত্বহীনতা দেখা দেয়।

আমেরিকান সাহিত্যেক জেমস. এ. পাইক নিয়তিবাদের সমালোচনা করতে গিয়ে ধর্মীয় স্বর্গ-নরক ধারণার একটি সকৌতুক ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে,
সম্পূর্ণ পূণ্যের অবস্থা আরেকটি সম্পূর্ণ পাপের অবস্থা এই দুই সম্পূর্ণ অন্তহীন বিরোধী অবস্থার যে কোন একটি পরম স্তরেই ব্যক্তি থাকতে পারবে। এই সম্পূর্ণ পূণ্যের অবস্থাই হলো স্বর্গ। এই স্বর্গে যাওয়ার জন্য প্রার্থীদের যেসব গুণাবলী দেখাতে হয় তার একটি প্রধানগুণ হলো পরার্থপরতা বা নিঃস্বার্থ ভালবাসা। প্রশ্ন হলো একজন মৈত্রী করুণাভাবাপন্ন পরার্থপর মানুষ কিভাবে স্বর্গে বাস করতে পারে, যেখান থেকে ঈশ্বর স্থায়ীভাবে অন্যদের বাইরে রেখেছে। যাদের নিজেদের পরিবর্তন করার কোন সুযোগ নেই বা পরিতৃপ্তির কোন আশা নেই। তাই স্বর্গীয় সেসব মহান এবং মহৎ ব্যক্তিদের বিবেক কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে যা থেকে তারা মহান ঈশ্বরের সামনে প্রতিবাদ জানাতে পারে অথবা আরো বেশীকিছু, যেমন নরকবাসীদের সেখান থেকে উদ্ধারের জন্য উদ্ধার দল (Rescue party) তৈরি করতে পারে।
---- এই সমালোচনাটি আক্ষরিক অর্থে না নিয়ে ভাবার্থ করলে দাঁড়ায় যে অদৃষ্টবাদ মেনে নিলে ঈশ্বর সর্বক্ষমতাময় হয়েও কাউকে পূণ্যের পথে, কাউকে পাপের পথে কেনই বা চালাবেন, কেনই বা তিনি শাস্তির মত অমানবিক কাজ করবেন, কেনই বা তা বিবেকবান মানুষ মেনে নেবে। এজন্যই অদৃষ্টবাদীরা ব্যক্তির যে কোন অবস্থাকেই ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে মেনে নেয়ার কথা বলে এবং প্রতিরোধকে অনুৎসাহিত করে (ব্যতিক্রম আছে)।

প্রকৃতপক্ষে, যৌক্তিক বা বিচারবিশ্লেষণ ভিত্তিক আলোচনায় অদৃষ্টবাদ মেনে নেয়া যায় না। তারপরও প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র অংশ হিসাবে মানুষ অসহায়। ব্যক্তি মানুষের নানা ক্ষুদ্রতা, ব্যর্থতা, সসীমতা, অন্যদিকে তার আশা, পূর্ণতাবোধ, অসীমতার ধারণা সব মিলিয়ে কোন না কোনভাবে ভাগ্য বা নিয়তির কথা কোন না কোন সময় বিশ্বাস করে ফেলে, বিশেষ করে জটিল বা সংকটজনক অবস্থায়। স্বামী বিবেকানন্দ তার 'মায়া' বিষয়ক আলোচনায় বলেছিলেন -
"প্রত্যেক বালক জন্ম হইতেই আশাবাদী; সে সুখের স্বপ্নই দেখে। যৌবনে সে অধিকতর আশাবাদী হয়। মৃত্যু, পরাজয় বা অপমান বলিয়া কিছু আছে- কোন যুবকের পক্ষে ইহা বিশ্বাস করা কঠিন। বৃদ্ধাবস্থা আসিল- জীবন ধ্বংসরাশিতে পরিণত হইল, সুখস্বপ্ন আকাশে বিলীন হইল; বৃদ্ধ নৈরাশ্যবাদ অবলম্বন করিলেন। এইরূপে আমরা প্রকৃতি তাড়িত হইয়া আশাশূন্য ও উদ্দেশ্যহীনের মতো এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্তে ধাবিত হইতেছি।"
মানুষ সময়ে সাথে সাথে যখন ভীষণ প্রতিরোধের সামনে পড়ে, তখন কোন না কোনভাবে অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়ে। তাছাড়া, আমাদের সামাজিক ও ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির মধ্যে থেকে কিছুটা হলেও শিশুকাল থেকেই অধিকাংশের মনে অদৃষ্টবাদের বীজ বপন হয়ে যায়। কজনেই আর বার্ট্রান্ড রাসেল বা হুমায়ূন আজাদের মতো নিরাপোষ যুক্তিবাদী থাকতে পারে জীবনের শেষ পর্বেও।

হয়তো অদৃষ্টই আমাকে এ লেখা লেখাচ্ছে। আবার হয়তো স্বাধীন ইচ্ছা দ্বারা স্থির হয়েই লেখাটা লিখছি। যে যেভাবে ইচ্ছা বলতে পারে। তবে, ভাবনা যেভাবেই হোক; কল্যাণ কামনা নিয়ে আনন্দচিত্তে কর্ম করে যাওয়াটাই দরকার। ভাগ্যের ভরসায় ভাগ্যে বিশ্বাসীরাও বসে থাকে না। বরং ভাগ্যে বিশ্বাসের কথা বলে অন্যকে প্রতারিত করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়ার লোকের অভাব নেই। ভাগ্যে বিশ্বাস করে নিশ্চল হয়ে থাকার চেয়ে যতক্ষণ শক্তি আছে, বুদ্ধির সাহায্যে এগিয়ে চলাই শ্রেয়- তাতে ভাগ্যও হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সহায় হয়। তাই অদৃষ্টবাদ, মতবাদ হিসেবে শুধু পড়ে যাওয়াই ভালো- মনে বা কাজে একে স্থান দেয়া সমীচিন নয়।

----##----
Read More ... »

Oct 15, 2008

ভাগ্য বা অদৃষ্টবাদ প্রসঙ্গে- ১ম অংশ

শিবাজি দে
সহকারী অধ্যাপক
আব্দুলপুর সরকারি কলেজ, নাটোর।

আমাদের এই চলমান জীবনে আমরা প্রায়ই নানাভাবে নানাশব্দে ভাগ্যের কথা বলি। যেমন:

* তোমার সৌভাগ্য যে একবারেই বিষয়টা বুঝেছ,
* তোমার দুর্ভাগ্য যে, যে কাজেই হাত দাও তাই ব্যর্থ হচ্ছো,
* যেখানে তোমার রিজিক আছে সেখানেই তো খাবে,
* গুরুর কৃপায় আমি ব্যবসায় উন্নতি করেছি,
* অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে আজ তার এই অবস্থা,
* কপালের লিখন, না যায় খন্ডন--- ইত্যাদি

প্রকৃতপক্ষে এ জগত খুব জটিল। প্রকৃতিতে সবসময়ই নানা বিচিত্র ও আকস্মিক ঘটনা ঘটে চলেছে। ঘটনা ঘটার পরে আমরা তার ব্যাখ্যা দাড় করাই কিন্তু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে সিদ্ধান্ত করা অধিকাংশক্ষেতেই অসম্ভব। যেহেতু মানুষ নিজেকে, নিজের ভবিষ্যৎ, আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন- এসব কিছুই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাই সময়ভেদে কোন না কোনভাবে (ব্যতিক্রমী দু'একজন ছাড়া) নিজেকে অদৃষ্টের হাতে সমর্পণ করে।

ভাগ্য বা অদৃষ্টবাদ আমাদের মনে করায় আমাদের সসীমতা, আপেক্ষিক ধ্যান-ধারণা, প্রকৃতির বিশাল ব্যপ্তির মাঝে নিজের ক্ষুদ্রতা। তাছাড়া ধর্মীয় ধারণায় আমরা আমাদের ক্ষুদ্রতার সাথে ঈশ্বরের অসীম সত্ত্বার বিশাল পার্থক্য দেখি। ঈশ্বর সর্বতোভাবে ভাল, কিন্তু বিশেষভাবে তিনি সর্বক্ষমতাময় ও সর্বজ্ঞ। সসীম মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি ও জগতের পরিকল্পনা সম্বন্ধে কখনোই জানতে পারে না। কেন আমরা জন্মেছি এবং কেন আমাদের নানাভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, যেমন- নারী কিংবা পুরুষরূপে, বুদ্ধিমান কিংবা নির্বোধ করে, ফর্সা কিংবা কালো করে, লম্বা কিংবা খাটো করে- এসব ঈশ্বরের দুর্বোধ্য সৃষ্টিরহস্য- যা কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয়। নিয়তিবাদ বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয় মানুষের মূল লক্ষ্যে (মোক্ষ, স্যালভেশন, নির্বাণ ইত্যাদি)। এই লক্ষ্যগুলো ঈশ্বরের পরম ইচ্ছার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও নির্বাচিত। ঈশ্বরই এই লক্ষ্য সম্বন্ধে জ্ঞাত, কিন্তু তা চিরদিনই মানুষের কাছে অনির্ধারযোগ্য।

অদৃষ্টবাদ বা নিয়তিবাদের রয়েছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। মানুষের সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে যখনই সে প্রকৃতিকে কিছু কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে, দেখা দিয়েছে সামনের বিশাল অনিশ্চয়তা। নিজের মেধা, শক্তি, পরিশ্রমের পাশাপাশি তাই মানুষ সর্বদাই ভাগ্যেরও সহায়তা চেয়েছে। বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন সমাজে মানুষ নানাভঅবে ভাগ্যের সহায়তা লাভের জন্য নানারকম কল্পনা করেছে, যাদুমন্ত্রের উদ্ভব ঘটেছে, সেখান থেকে নানা দেব-দেবী থেকে একেশ্বর মহাশক্তিকে খুশী করার নানা ক্রিয়া-পদ্ধতি গড়ে উঠেছে। মানুষের সংস্কৃতিতেও এর প্রভাব বিস্তীর্ণ ও গভীর। তাছাড়া মানুষ উন্নত মেধাসম্পন্ন জীব বলেই হয়তো তার মধ্যে পূর্ণতার ধারণা রয়েছে। মানুষ সবসময় চায় স্থায়ীভাবে কিছু পেতে। কিন্তু এই পরিবর্তনশীল জগতে পূর্ণতাপ্রাপ্তি সম্ভব নয়। তাই মানুষ অবিরত ছুটে চলেছে পূর্ণতা প্রাপ্তির আশায়। এখানেও নিয়তির সহায়তা ছাড়া কল্পিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই ভাগ্য বা নিয়তির প্রতি দুর্বলতা মানুষের ছিল এবং আজো রয়ে গেছে।

প্রাচীন পুরাণ বা সাহিত্যগুলোতে ভাগ্য বা অদৃষ্টবাদের প্রভাব ছিল খুবই বেশি। প্রাচীন গ্রীকরাও মনে করতো তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করছে আকাশের তারা, গ্রহ বা উপগ্রহ। জ্যোতিষশাস্ত্র প্রাচীন যুগে মানুষের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। প্রাচীন মহাকাব্যগুলিতে দেখা যায়, বিভিন্ন দেব-দেবী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে মানুষ। সফোক্লিসের 'ইডিপাস'-এ দেখতে পাই অদৃষ্টের নির্মম করাঘাতে দেবতাদের ভবিষ্যৎবাণীর জন্য ইডিপাসের জীবনে কি হৃদয়-বিদারক ঘটনা ঘটে গেল। সক্রেটিস, যিনি মানুষের জ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান আলোকবর্তিকা উত্তোলনকারী, যাকে সভ্য-সংস্কৃত মানুষ আদর্শ শিক্ষক হিসেবে মনে করে, সেই সক্রেটিস ডেলফির মন্দির থেকে দেবীর দৈববাণী শুনেছিলেন বলে কথিত আছে। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মহাকাব্য 'মহাভারতে' নানাভাবে নিয়তিবাদের সমর্থণ দেখতে পাই। ব্যাসদেব ছিলেন ত্রিকালদর্শী। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবই তিনি জানতে পারতেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছিলেন, "পুত্র এই যুদ্ধে তোমার পুত্রেরা ও অন্যান্য রাজাগণ বিনষ্ট হবে, তুমি শোক কোরো না, কালবিপর্যয় লক্ষ্য করো।" পরে ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সরাসরি বর্ণনা শুনেন। এখানে দেখি, নিয়তি পূর্ব থেকেই নির্ধারিত ছিল। মহাভারতের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পান্ডবদের বনবাসের সময় ধর্ম্মরাজের কাছে যুধিষ্ঠিরের পরীক্ষা। যুধিষ্ঠিরের অন্যান্য ভাইদের জীবনরক্ষার জন্য তাকে ধর্ম্মরাজের অনেকগুলো অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছিল। যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করা হয়েছিল 'বার্তা' কি? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, "সূর্যের আগুনে দিন-রাত্রির ইন্ধনে, মাস ও ঋতুর হাতা দিয়ে নেড়ে নেড়ে কাল এই মহামোহময় কটাহে প্রাণীবৃন্দকে রন্ধন করছে- এই বার্তা।" এখানে জীবন-মৃত্যুর সম্পূর্ণ বৃত্ত, বৃদ্ধি-ক্ষয়ে ঘুর্ণমান সর্বজীবের জীবনের রূপচিত্র দেখা যায়। মহাকালের কাছে মানুষ নিতান্তই ক্ষুদ্র, সে নিতান্তই প্রকৃতির ক্রিড়নক। এ বিষয়টিই প্রকাশ পাচ্ছে এখানে। অন্য জায়গায় কৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন, "হে অর্জুন, ঈশ্বর সর্বজীবের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত হয়ে, যন্ত্রারূড় (পুতুলের মতো) সর্বজীবকে মায়ার দ্বারা চালনা করেন।" এখানেও আমরা জগৎ পরিচালনায় ঈশ্বরের মহাপরিকল্পনারই বাস্তবায়ন দেখি। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা এক্ষেত্রে অবান্তর বলেই মনে হয়।

বর্তমান যুগে প্রচলিত ধর্মমতসমূহেও নানাভাবে অদৃষ্টবাদের সমর্থণ দেখা দেয়। ধর্মমতগুলিতে যেহেতু জগৎ ও জীবনের নানা জটিল বিষয়গুলোকে একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা করা হয় তাই সেখানে নানা দ্ব্যর্থকতা, রূপকতা থাকে। তাই দেখা যায় একই ধর্মগ্রন্থের একই প্রত্যাদেশ নিয়ে নানা ব্যাখ্যা, নানা মত, এমনকি নানান সম্প্রদায়ও গড়ে ওঠে। ধর্মমতগুলোতে কখনও মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়, আবার কখনও অস্বীকার করে অদৃষ্টবাদকে সমর্থন করা হয়। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই প্রচলিত ধর্মমতগুলোতে বিশ্বাসী হওয়ায় ধর্মের গুরুত্ব মানুষের জীবনের খুবই গভীর। তাই বিভিন্ন ধর্মমতে অদৃষ্টবাদ সম্পর্কে কিছু বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন।

শ্রীমদ্ভগবতগীতা হিন্দুধর্মের একটি প্রধান ধর্মগ্রন্থ। এই মহান ধর্মগ্রন্থের 'বিশ্বরূপ দর্শন' নামক একাদশ অধ্যায়ে ভক্তবৎসল ভগবান অর্জুনকে দিব্যচক্ষু প্রদান করে স্বীয় বিশ্বরূপ দেখান। অনির্বচনীয়, অদৃষ্টপূর্ব, অত্যদ্ভূত সেই বিশ্বরূপ; তাতে একত্র সমবস্থিত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দৃশ্যমান, যার আদি নাই, অন্ত নাই, মধ্য নাই। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ব্যাপারে যা ঘটবে, ভগবান বিশ্বরূপে সেই ভবিষ্যৎ দৃশ্যটিও দেখান। অর্জুন বিস্ময়ে ভয়ে আপ্লুত হয়ে অবনত মস্তকে ভগবানকে প্রণাম করেন। পরে ভগবান বলেন যে তিনি লোকক্ষয়কারী মহাকাল। বাস্তবিক সকলকেই তিনি নিহত করে রেখেছেন।, অর্জুন শুধু এই যুদ্ধের নিমিত্তমাত্র। এখানে আমরা দেখি সবকিছু পূর্বথেকেই ঈশ্বর নির্ধারিত করে রেখেছেন, মানুষ শুধুই নিমিত্তমাত্র। ঈশ্বর কর্মনীতির কর্তা এবং তিনিই মানুষকে তার কর্মের পুরস্কার বা শাস্তি প্রদান করেন, সেইজন্য কর্মফল ঈশ্বরে সমর্পণ করতে হয়।

আবার শ্রীমদ্ভগবৎগীতাতে কর্মযোগেরই জয়জয়কার। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাবলে মানুষ যেরকম কামনার দ্বারা কর্ম করে, জন্মজন্মান্তরে স্বাধীন ইচ্ছাবলে মানুষ যেরকম কামনার দ্বারা কর্ম করে, জন্ম জন্মান্তরে সেই কর্মেরই ফল ভোগ করে। গীতায় স্বকর্ম বা স্বভাবকর্মের কথা বলা হয়েছে। মানুষ নিজেই স্ব-ইচ্ছায় কার্য করে এবং তার জন্য নিজেই দায়ী থাকে। তাই মানুষের কর্মফল অনুযায়ীই তার অবস্থান নির্দিষ্ট হয়। তবে যেহেতু কর্মমাত্রই কোন না কোনভাবে দেষযুক্ত থাকে তাই কর্মফল অবশ্যম্ভাবী, তাই গীতায় ফলত্যাগ করে অনাসক্তচিত্তে কর্ম করার কথা বলা হয়েছে- এতে কোন বন্ধন থাকে না। যারা মনে মনে সমস্ত কর্ম ঈশ্বরে অর্পণ করে সর্বদা ঈশ্বরে চিত্ত রাখে এবং স্বকর্ম করতে থাকে তারা ঈশ্বরের প্রসাদে কর্মের শুভাশুভ ফল অতিক্রম করে মোক্ষলাভ করতে পারে।

ন্যায়-দর্শনে ঈশ্বরের স্বরূপ সম্পর্কে বলা হয় - ঈশ্বর সর্বজ্ঞ। তিনি নিখিল জগৎ এবং জীবের নিমিত্তকারণ। তিনি শ্বাশত পরম সত্তা। তিনি অসীম চৈতন্যের অধিকারী। ঈশ্বরই কর্মফল প্রদান করেন। ঈশ্বরের প্রভাবেই জীব এবং জগতে সংগতি ও শৃঙ্খলা পরিদৃষ্ট হয়। তিনি সমগ্র জীবের মধ্যে এবং জাগতিক কার্যের মধ্যে কল্যাণের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জগতের স্রষ্টা, রক্ষাকর্তা এবং সংহারকর্তা। ঈশ্বরের মহাকরিকল্পনাতেই জগতের সবকিছু বিরাজমান এবং পরিবর্তনশীল।

আবার ন্যায়-দর্শন মনে করে মোক্ষই মানুষের পক্ষে কাঙ্ক্ষনীয় চরম সদ্বস্তু; পরম সুখ এবং শান্তির অবস্থা। সর্বপ্রকার ক্ষুদ্রতা, সংকীর্ণতা, ভেদ, অজ্ঞতা এবং দুঃখ হতে বিমুক্তি অপেক্ষা মানুষের পক্ষে শ্রেয়তর কিছুই নাই। মিথ্যাজ্ঞান ও অবিদ্যা হেতু দুঃখ হয়। অজ্ঞানতাবশতঃ মানুষ নিজেকে কর্তা, জ্ঞাতা এবং ভোক্তা মনে করে। আত্মাকে সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ প্রভৃতির অধীন মনে করে মোহগ্রস্ত হয়। আত্মাকে এরূপ মনে করাই অবিদ্যা। অবিদ্যা দূরীভূত হলে দোষ, প্রবৃত্তি, জন্ম এবং দুঃখ একে একে বিলুপ্ত হয়। পতঞ্জলি বর্ণিত যোগাঙ্গগুলির সাধনা করলেই দুঃখ নিবৃত্ত হয়। প্রকৃত মুক্তি সত্যজ্ঞান হতেই সম্ভব হয়।

এখানে ঈশ্বরের স্বরূপ বর্ণনায় অদৃষ্টবাদের সমর্থন লক্ষ্য করলেও মানুষের মোক্ষলাভের জন্য তার নিজেকেই কর্ম করতে হবে, মুক্তির সাধনা করতে হবে। একদিকে অদৃষ্টবাদ, অন্যদিকে আশাবাদ মিলেমিশে একাত্ম হয়ে আছে।


অসমাপ্ত
Read More ... »
 
-:- -:-